kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজশাহীতে বেন্টুর ‘বালু সাম্রাজ্য’

পাঁচ বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাঁচ বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি

পাঁচ বছর আগে নগরবাসী যে বালু প্রতি ট্রাক কিনত এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দরে সেই বালু হঠাৎ করেই এক লাফে গিয়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকায়। কারণ ‘বালু সাম্রাজ্যে’ তিনি যা বলেছেন সেটাই হয়েছে। এই তিনি হলেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু।

গত পাঁচ বছর বেন্টু ও তাঁর লোকজনের দখলে ছিল পদ্মার ১১টি বালুমহাল। এ সময়ে এসব বালুমহাল জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বলতে গেলে পানির দরে গোপনে ইজারা নেওয়া হয়। চলতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে বালুমহালগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে। এবারের ইজারামূল্যের সঙ্গে তুলনা করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের পাঁচ বছরে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কালের কণ্ঠে গত ৯ অক্টোবর আজিজুল আলম বেন্টুকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তাঁর উত্থান ও অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর বেন্টুর অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

রাজশাহী নগরের হড়গ্রামের বাসিন্দা বেন্টু ও তাঁর পরিবারের লোকজন ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ট্রাকচালকের কাজ ছেড়ে মাছ বিক্রি, এরপর বাড়িতে খামার করে দুধ বিক্রিসহ নানা পেশায় জড়িত ছিলেন। আমিন ডেকোরেটর নামের একটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানও ছিল তাঁর। পরে ‘আমিন ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দু-একটি বালুমহাল ইজারা নিতে শুরু করেন। একসময় রাজশাহী নগর ও আশপাশের উপজেলায় পদ্মা নদীর ১১টি বালুমহালের মধ্যে বড় ছয়টির একক নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে আসে। বাকি পাঁচটির ইজারাও তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং তাঁর লোকজনই ইজারা পেত।

ইজারার বিবরণ অনুযায়ী, বাংলা ১৪২১-২৫ সাল পর্যন্ত এসব বালুমহাল বেন্টু ও তাঁর লোকজনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এর মধ্যে ২০১৭ সালে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন বেন্টু।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে নগরী ও গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট উপজেলায় পদ্মা নদীর ১১টি বালুমহাল ইজারার দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত ৬ মার্চ দরপত্র বাক্স খোলা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৪২৫-২৬ মৌসুমের জন্য ১১টি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয় সর্বোচ্চ দরদাতাদের মধ্যে। রাজস্ব আদায় হয় ১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর যোগ হয়ে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগের পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে সাড়ে তিন কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ চলতি বছরেই আদায় হয়েছে তার প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

জেলা প্রশাসকের দপ্তর সূত্র থেকে জানা গেছে, পবার নবগঙ্গা-হাড়ুপুর বালুমহালটি এবার পাঁচ কোটি দুই লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা রজব আলী। গত বছর তিনি মাত্র পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকায় বালুমহালটি ইজারা নিয়েছিলেন। একই উপজেলার মদনপুর, কসবা ও চরহরিপুর বালুমহালটি গত বছর বেন্টুকে ইজারা দিয়ে সরকার পেয়েছিল পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ১০০ টাকা। এর আগের তিন বছর মহালটি বেন্টুকেই ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এবার আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি চার কোটি ১০ লাখ টাকায় বালুমহালটি ইজারা নিয়েছেন। একই এলাকার চর খিদিরপুর ও চর শ্যামপুর মহালটির ইজারামূল্য গত বছর ছিল সাত লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা। আগের কয়েক বছর এর চেয়েও কম দরে মহালটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। অথচ এবার বেন্টু মহালটি ইজারা নিয়েছেন দুই কোটি দুই লাখ টাকায়। একইভাবে গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আটটি বালুমহালের এবারের ইজারামূল্য আগের কয়েক বছরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

সূত্র মতে, বেন্টু মূলত রাজশাহী নগরীর তিনটি ও গোদাগাড়ীর তিনটি বালুমহাল সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই ছয়টি বালুমহাল থেকেই এবার রাজস্ব আদায় হয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মতো। অথচ এর আগে এসব ঘাট থেকে সর্বোচ্চ আদায় হয়েছে এক কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি বালুমহাল থেকে এর আগে যেখানে আদায় হয়েছে সর্বোচ্চ ২৩ লাখ টাকা, এবার সেখানে আদায় হয়েছে ১৩ কোটি টাকা।

রাজশাহীর একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ নেতা বেন্টুর দাপটে নগরবাসী ছিল অতিষ্ঠ। তিনি যখন যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে বালুর দাম বাড়িয়েছেন। বেন্টুর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বালুমহাল টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের একটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হবে। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে কম মূল্যে বালুমহাল ইজারা দিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে আজিজুল আলম বেন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়ম করিনি। এ ছাড়া আমার সম্পদের তথ্য যাঁরা নিচ্ছেন তাঁরা নিতে পারেন। এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা