kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ছেঁউড়িয়ায় শুরু লালনোৎসব

সাধন-ভজনে মুখর সাঁইজির ধাম

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাধন-ভজনে মুখর সাঁইজির ধাম

ছেঁউরিয়ায় লালন ভক্তদের সংগীত পরিবেশনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার কালিগঙ্গার পার এখন ভক্তকুলের পদচারণে মুখরিত। দিনে-রাতে সাঁইজির ধামে ছুটে আসছে হাজারো মানুষ। বাউলসম্রাট ফকির লালনের ১২৯তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনের উৎসবে অংশ নিতে দলে দলে আসছে লালনভক্তরা। আসছেন লালনদীক্ষিত হাজারো সাধু-গুরু আর বাউলরা। তাঁরা ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় আসন গেড়ে সাধন-ভজনে মেতে উঠেছেন। লালন তিরোধানের এই আয়োজনেও বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ছাপ পড়েছে।

ভক্তদের কারো হাতে একতারা, কারো হাতে ঢোল, কারো হাতে বাঁশি। তাদের একটাই চাওয়া—গুরু দর্শন লাভ। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে সাঁইজির অমর বাণী ‘বাড়ির পাশে আরশী নগর, সেথা এক পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’; কিংবা ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

কালিগঙ্গার পারে ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে তিন দিনের লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান। উৎসব চলবে আগামী শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত। গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উৎসবের উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। এদিনের মুখ্য আলোচক ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান। এ ছাড়া কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার জাহান বাদশা, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আজাদ জাহান, পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত প্রমুখ বক্তব্য দেন।

মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘আজ আমি এখানে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে এসেছি। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার আমাদের এই কুষ্টিয়ার সন্তান। কদিন আগে নির্মমভাবে সহপাঠীদের হাতে খুন হয়েছে। আবরারের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। লালন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু সারা জীবন শান্তি ও কল্যাণের কথা বলে গেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই হয় না, লালনের মতো শিক্ষাও আজ আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন।’

আয়োজকরা জানান, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই তিরোধান দিবসের উৎসবে আসা বাউল-সাধুরা চাল-জল গ্রহণের মাধ্যমে ‘রাখালসেবা’ গ্রহণ করে তাঁদের আনুষ্ঠানিক আচার শুরু করেন। রাতে তাঁদের ‘অধিবাস’ গ্রহণ সম্পন্ন হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ‘বাল্যসেবা’, দুপুরে ‘পুণ্যসেবা’র মধ্য দিয়ে লালন ধামে আসা সাধু-গুরু ও ভক্তরা তাঁদের সাধুসঙ্গ শেষ করবেন।

লালন একাডেমির আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তিন দিনের এ উৎসবে রয়েছে লালন মেলা, লালনের জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা এবং লালনের গান। তিরোধান দিবসের এই মিলনমেলায় কেউ এসেছে সাদা পোশাকে। কেউ বা গেরুয়া বসনে। তারা লালনের সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে রেখেছে বাউল ধাম।

লালন একাডেমির সদস্য সেলিম হক জানান, গতকাল প্রথম দিন বিকেলের মধ্যেই খেলাফতধারী সাধু-গুরুরা তাঁদের সেবাদাসী এবং লালনভক্ত-অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে সাঁইজির আখড়াবাড়িতে নিজ নিজ আসনে বসে তাঁদের কার্যক্রম শুরু করেছেন। লালন একাডেমি তিন দিন অনুষ্ঠান করলেও প্রকৃত বাউল-সাধুদের মূল অনুষ্ঠান দেড় দিনে শেষ হয়ে যায়।

বাউল ফকির বলাই শাহ বলেন, সাধু-গুরুদের নিয়ম অনুযায়ী ধ্যান-জ্ঞানের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টায় চারটি সেবা রাখালসেবা, অধিবাসসেবা, বাল্যসেবা এবং পুণ্যসেবা গ্রহণ করা হয়। এ সময় তাঁরা একই স্থানে বসে উপাসনা ও আরাধনা করেন। সন্ধ্যালগ্নে মুড়ি, চিড়া ও বাতাসা দিয়ে যে খাবার দেওয়া হয় তাকে বলে ‘রাখালসেবা’। রাখালসেবার পর আবার রাত ১২টায় কলার পাতায় সাধুদের খিঁচুড়ি খেতে দেওয়া হয়। এটাকে বলে ‘অধিবাসসেবা’। অধিবাসসেবার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাধুদের প্রথম দিনের আচার।

লালন মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আলী বলেন, দ্বিতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবার শুরু হবে বাউলদের অষ্টপ্রহরের সাধুসংঘ। এদিন ভোরে দিনটিকে স্বাগত জানিয়ে ‘গোষ্ট্য গানে’র মধ্য দিয়ে বাউলদের দ্বিতীয় দিনের আচার-অনুষ্ঠান শুরু হবে। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হয় তাদের বিভিন্ন কার্যকরণ বাল্যসেবা। গুরু-শিষ্যের ভাব আদান-প্রদান, লালনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা আর সেই সঙ্গে চলে নিজস্ব ঘরানায় লালনের গান। পরে পুণ্যসেবা নিয়ে যার যার গন্তব্যে রওনা হবেন বাউলরা। এবারও সাঁইজির ধামে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা