kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘দস্যুমুক্ত’ সুন্দরবনে দস্যুদেরই পদচিহ্ন

এখনো কয়েকটি গ্রুপ সুন্দরবনে চাঁদাবাজি লুটপাটসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘দস্যুমুক্ত’ সুন্দরবনে দস্যুদেরই পদচিহ্ন

দিনটি ছিল ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর। ‘সুন্দরবন দস্যুমুক্ত’ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি আসে ওই দিনেই। সেদিন একযোগে আত্মসমর্পণ করেছিল ৫৪ দস্যু। এর আগেও অনেক দস্যু দফায় দফায় হাত থেকে বন্দুক সরিয়ে নিয়েছিল। এরপর বছরও ঘোরেনি। বনের দস্যুরা বুক চেতিয়ে জানান দিচ্ছে আমরা এখনো আছি! দস্যুদের আত্মসমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি চেষ্টা খানিকটা বুমেরাং। ধারণা করা হয়েছিল, সুন্দরবনে এখন আর দস্যুদের পদচিহ্ন নেই। কিন্তু ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণার বছর না ঘুরতেই বনে ফের যেন ‘মাতাল’ হয়ে উঠেছে দস্যুদল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধও ঘটছে ঘনঘন। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সুন্দরবনের কয়রা খালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দস্যুনেতা আমিনুলসহ প্রাণ ঝরেছে চারজনের।

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার যেসব মানুষ নিয়মিত মাছ ও মধু সংগ্রহের জন্য বনে যায় তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছিল, বিষয়টি এমন নয়; তবে দস্যুদের তৎপরতা অনেক কমেছিল। দস্যুদের তৎপরতা সম্প্রতি ফের বেড়েছে। সুন্দরবনের পশ্চিমাংশ শ্যামনগরের হরিনগর এলাকার একাধিক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দস্যুরা আসলে আমাদের মধ্যেই বাস করে। এদের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিরা পৃষ্ঠপোষকতা করে। তারা অনেকেই মারধর নিয়ে বনে যায়। মাছ ধরে। আবার জেলেদের বন্দি করে টাকা হাতিয়ে নেয়। এই টাকার ভাগ এলাকার ক্ষমতাধর মানুষের কাছেও যায়। প্রভাবশালীরা তাদের আয়ের একটি উৎস হিসেবে দস্যুদের পোষে। এ কারণে বন দস্যুমুক্ত করা খুব মুশকিল।

জানা যায়, অনেক বছরের চেষ্টায় যেসব দস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য আত্মসমর্পণ করানো সম্ভব হয়েছিল; এর বেশির ভাগেরই বাড়ি বাগেরহাট অঞ্চলে। বর্তমানে সুন্দরবনের ওই অংশে দস্যুদের তৎপরতা কম। এখন খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় দস্যু তৎপরতা বেশি। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও বরগুনার ২২টি উপজেলা থেকে একদল পেশাজীবী মানুষ বনে মাছ

ধরার জন্য যায়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, মহেশখালী অঞ্চলের লোকজনও যারা প্রধানত সমুদ্রে মাছ ধরে, তারাও একটি নির্দিষ্ট সময় (পাঁচ থেকে সাত মাস) সুন্দরবনের সমুদ্রপাড়ের দুবলার চর এলাকায় থাকে। এসব বনজীবী বা জেলেরাও প্রায়ই চাঁদাবাজ ও দস্যুদের কবলে পড়ে।

বাগেরহাটের রামপালের হুড়কা এলাকার এ রকম একজন সদস্য, যিনি প্রতিবছরই সুন্দরবনে মৌসুমভিত্তিক মাছ আহরণে যান তিনি বলেন, গত বছরও তাঁদের ট্রলার একাধিকবার দস্যুদের কবলে পড়ে। ওই ট্রলার থেকে দুজনকে দস্যুরা তুলেও নিয়ে গিয়েছিল। তাদের চাহিদা পূরণ করা হলে তাদের আবার ফেরত দিয়ে যায়।

গতকাল মঙ্গলবার ভোরে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব-৬-এর ভারপ্রাপ্ত স্পেশাল কম্পানি কমান্ডার সহকারী পুলিশ সুপার মো. তোফাজ্জল হোসেন জানান, তাঁরা সুন্দরবনে দস্যুদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যা দু-একটি গোষ্ঠী এখনো তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে তাদেরও নির্মূল করা হবে।

সুন্দরবনে দস্যুতা ও দমন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, দস্যুতা বিষয়টি আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, সঙ্গ ও অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চেষ্টা করছেন সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে। বন দস্যুমুক্ত ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা আছে এখন হয়তো তাদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তারাও অচিরেই নির্মূল হয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা