kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অর্থনীতিতে তিন বিজ্ঞানীর নোবেল

আরেক বাঙালির নোবেল জয়

দারিদ্র্য হটানোর গবেষণায় তাঁর ফরাসি স্ত্রী এবং আরেক আমেরিকানও পেলেন এই সম্মান

সাব্বির খান, সুইডেন থেকে   

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আরেক বাঙালির নোবেল জয়

তাঁদের পদ্ধতিগত উদ্ভাবন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবদান রাখছে; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায়ও রাখছে বড় ভূমিকা। দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমি এ কথা জানিয়ে ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া তিনজনের নাম ঘোষণা করেছে। তাঁদের একজন হলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি অভিজিৎ ব্যানার্জি, আরেকজন তাঁর ফরাসি স্ত্রী এস্তার ডুফলো এবং অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ক্রেমার।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টায় সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের স্থায়ী সেক্রেটারি গোরান হ্যানসন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য এই তিন অর্থনীতিবিদকে অর্থনীতিতে বিকল্প নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো। তাঁদের গবেষণা বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের এর আগে অর্জিত দক্ষতাকে আরো উন্নত করেছে। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে তাঁদের পরীক্ষামূলক পদ্ধতিগত উন্নয়ন এখন বিশ্বব্যাপী গবেষণার সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার সর্বোত্তম উপায় কী হতে পারে সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়ার জন্য একটি নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন এ বছরের বিজয়ীত্রয়।’

সুইডিশ একাডেমি বলেছে, তাঁরা দেখিয়েছেন, কিভাবে তাঁদের উদ্ভুত ডিজাইন অনুসরণ করে, ছোট ছোট পরিসরে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলির সবচেয়ে ভাল উত্তর পাওয়া যায়।

১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে মাইকেল ক্রেমার (৫৪) এবং তার সহকর্মীরা পদ্ধতিটি কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা মাঠ পর্যায়ে সফল প্রয়োগের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন। কেনিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এই ‘ক্ষুদ্র পরিসর’ পদ্ধতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোতে যথেষ্ঠ ভাল ফলাফল লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অভিজিৎ ব্যানার্জি (৫৮) এবং এস্তার ডুফলো (৪৬) প্রায়ই মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে তাঁদের ইস্যুভিত্তিক গবেষণাগুলো বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করতেন। তাঁদের পরীক্ষামূলক গবেষণা-পদ্ধতিগুলি আধুনিক বিশ্বের ‘উন্নয়ন-অর্থনীতিতে’ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই তিন গবেষকের পদ্ধতি অনুসরণ করে দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। তাঁদের গবেষণার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে ৫০ লাখেরও বেশি ভারতীয় শিশু স্কুলে প্রতিকারমূলক প্রশিক্ষণের আওতাধীন বিভিন্ন প্রোগ্রাম থেকে সরাসরি উপকৃত হয়েছে। বিজয়ীত্রয়ের গবেষণার ভিন্ন এক উদাহরণ হলো, আগাম প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রচুর পরিমানে ভর্তুকি দেয়া, যা বিশ্বের অনেক দেশেই ইতিমধ্যে চালু করেছে।

অভিজিত ব্যানার্জি চতুর্থ বাঙালি হিসেবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করলেন। অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তার পূর্বে অমর্ত্য সেন এই বিরল সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন। অভিজিতের বাবা দীপক ব্যানার্জি ছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান। মা নির্মলা ব্যানার্জিও ছিলেন কলকাতার ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস’-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপিকা। অভিজিতের স্ত্রী ডুফলো সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে অর্থনীতির নোবেল পেলেন। এই বিষয়ে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় নারী তিনি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক অভিজিৎ এখন ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক অধ্যাপক হিসেবে এমআইটি-তে কর্মরত। ২০১৩ সালে অভিজিৎ এবং এস্থার ডাফলো যুগ্মভাবে ‘আব্দুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশান ল্যাব’ গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বের দারিদ্র নিয়ে গবেষণার জন্যে। ১৯৬১ সালে মুম্বইয়ে জন্ম অভিজিতের। তিনি প্রাথমিক পড়াশোনা সারেন কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। সেই বছরই স্নাতকোত্তর পড়তে চলে যান জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভে তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইনফরমেশন ইকোনোমিক্স।’ অভিজিৎ  জাতিসংঘেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতি বিষয়ে তার লেখা চারটি বই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার মধ্যে ‘পুওর ইকোনোমি’ বইটি গোল্ডম্যান স্যাকস বিজনেস বুক সম্মানে ভূষিত হয়।

তার স্ত্রী ডুফলোও এখন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।  ১৯৭২ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জন্ম তার। তিনি ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউশন অব টেকনোলজি থেকে ১৯৯৯ সালে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে সেখানেই অধ্যাপনা করছেন।

মাইকেল ক্রেমার ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপদেষ্টা ছিলেন।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে বলে যাননি। বিশেষ সিদ্ধান্তে ১৯৬৯ সাল থেকে এ বিষয়ে একটি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। মূলত নোবেলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘দ্য ব্যাংক অব সুইডেন’ পুরস্কারটি প্রবর্তন করে। যেহেতু এই পুরস্কারও নোবেলের অন্যান্য পুরস্কারকে অনুসরণ করে একই সময় ঘোষণা ও প্রদান করা হয় এবং পুরস্কারের প্রাইজমানিও নোবেল পুরস্কারের মত একই অংকের তাই সম্মাননার দিক থেকে এই পুরস্কারও নোবেল পুরস্কারের মতই সমাদৃত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা