kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কাকরাইলে বেপরোয়া কাভার্ড ভ্যান

মাহিন এখনো জানে না মা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাহিন এখনো জানে না মা নেই

বরিশাল থেকে রাজধানীর মগবাজারের বাসার উদ্দেশে রাত ৮টায় এমবি-৬-এ চড়ে বসে মা মাসুদা বেগম (৩৫) ও ছেলে জিসান ইসলাম মাহিন (৯)। রাতে স্বামীর সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তখনও মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছোট ছেলে। তখন স্ত্রীকে প্রতিবারের মতো সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও প্রাইভেট কারের চালক স্বামীকে এবার না করেন মাসুদা। এই ‘না’ করাটাই যেন কাল হলো মোফাজ্জেল হোসেনের (স্বামী) সংসারে। প্রিয়তমা স্ত্রীর ওই নিষেধ মেনে হারিয়েছেন স্ত্রীকে আর ছোট ছেলে গুরুতর আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এখন জিসান।

গতকাল রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর কাকরাইলে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় রিকশা আরোহী মা মাসুদা ও ছেলে মাহিন গুরুতর আহত হয়। মাসুদার শরীরের বাঁ পাশ পিষে দিয়ে যায় ঘাতক কাভার্ড ভ্যান। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। চাপা দেওয়া কাভার্ড ভ্যানের চালককে গতকাল বিকেল পর্যন্ত আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে দুর্ঘটনার সময়ে ঘটনাস্থলে থাকা এক হকার জানায়, গাড়িটি এসএ পরিবহনের ছিল।

রমনা মডেল থানার ওসি মাইনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিহতের মৃতদেহ দুপুরে স্বজনদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। চালক ও কাভার্ড ভ্যানটি আটকের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় নিহত মাসুদার স্বামী রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। গাড়িতে এসএ টিভি লেখা ছিল। তবে গাড়িটি এসএ পরিবহনের কি না, সেটা বের করতে হবে।’

গতকাল ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখা যায় মাসুদার আত্মীয়-স্বজনের কান্নার রোল। দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে যখন লাশকাটা ঘর থেকে মাসুদাকে বের করে আনা হলে তখন তিনি চিরবিদায়ের অপেক্ষায়। স্বামীর চোখ তখন অশ্রুসজল। অসুস্থ সন্তানের কথাও যেন ভুলে গেছেন।

স্বামী প্রাইভেট কারের চালক মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘তারা মা-ছেলে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী গিয়েছিল। সেখান থেকে আজ (গতকাল) বাসায় ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। রাতে ওর (স্ত্রী) সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তখন বলে, ছেলে তার কোলে ঘুমাচ্ছে। সকালে মোবাইলের রিং পেয়ে ঘুম ভাঙে। এক লোক ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে যেতে বলেন। তখন মনে ভয় ঢুকে যায়। মাসুদার ফোনে রিং দিলে কেউ ধরে না। পরে হাসপাতালে গিয়ে দেখি সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। ছেলের অবস্থাও ভালো না। আমার স্ত্রীকে এসএ পরিবহনের কাভার্ড ভ্যান চাপা দিয়েছে। আমি মামলা করেছি। এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’ নিহতের পরিবার জানায়, তারা লঞ্চে সদরঘাট এসে রিকশাযোগে মগবাজারে ৩৫০ মধুবাগের বাসায় ফিরছিল। দুই ছেলের মধ্যে মাহিন ছোট, সে স্থানীয় শেরেবাংলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বিকেল ৩টার দিকে পঙ্গু হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা চলছে মাহিনের, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় সিটি ওয়ার্ডের পি-৪৬ ওয়ার্ডে রাখা হয় মাহিনকে।

জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ড. সানাউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাহিনের অবস্থা আস্তে আস্তে উন্নতির দিকে যাবে। হাত ও পায়ের ইনজুরি বেশি হয়েছে। আর কোমরে কিছুটা আঘাত পেয়েছে। এখন তেমন বড় কোনো ঝুঁকি নেই।’ চিকিৎসাধীন মাহিন এখনো জানে না তার মা পৃথিবীতে নেই। দীর্ঘক্ষণ তার চোখ মেলে তাকানোর অপেক্ষায় ছিল সবাই। একপর্যায়ে চোখ খোলে সে। এ সময় অস্পষ্টভাবে বলে, ‘আম্মু কই?’ এর বেশি কিছু বলার আগেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে মাহিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা