kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাক্ষাৎকার

দ্রুত যেতে চাই এশিয়ার ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে

শরীফুল আলম সুমন   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দ্রুত যেতে চাই এশিয়ার ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে

‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় আমাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে হয়েছিল। স্বাধীনতার পর দেখতে পেলাম, তৎকালীন পাকিস্তান আমাদের উচ্চশিক্ষা যথেষ্ট সীমিত করে রেখে গিয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখন আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছিল, তখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আসনের কারণে অনেকের উচ্চশিক্ষাও সীমিত হয়ে যাচ্ছিল। তখন আমাদের দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে যেত। এতে আমাদের অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও অপচয় হতো। আর এসব মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর দেশে ফিরে আসত না। তখন আমরা কয়েকজন শিক্ষানুরাগী অনুভব করলাম, মেধাবী শিক্ষার্থীদের যদি আমরা ধরে রাখতে পারি তাহলে দেশের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি মেধাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের মাধ্যমে দেশের উন্নতি করা সম্ভব।’ কথাগুলো বলছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ।

এই শিক্ষানুরাগী সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ওই ধারণা থেকেই আমরা সমমনা কয়েকজন শিক্ষানুরাগী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিই। আমাদের উদ্যোগের পর ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২’ প্রণয়ন করে সরকার। এরপর ১৯৯২ সালেই দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায়। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়া।”

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনটি বিষয়ের খুবই প্রয়োজন। প্রথমত আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থী পেতে হবে অথবা একটা পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাছাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজন, যাঁরা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিতে পারেন। ভালো শিক্ষকের জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই একটা মান বজায় রাখছি। যেসব শিক্ষক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবেন, তাঁদের মেধাবী হিসেবে পরিচিতি থাকতে হবে। পাশাপাশি একটা আন্তর্জাতিক ডিগ্রি থাকতে হবে। অর্থাৎ আমাদের এখানে শিক্ষক হতে হলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স অথবা পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে। যদিও প্রথম দিকে আমাদের কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আমরা আমাদের নীতি থেকে বিচ্যুত হইনি। বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষক আছেন, যাঁদের প্রত্যেকেরই একটা বিদেশি ডিগ্রি আছে। তবে বিদেশি ডিগ্রির অর্থ এই নয় যে দেশি ডিগ্রিকে উপেক্ষা করা। বিদেশি ডিগ্রি বলতে আমি বোঝাতে চাই, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। যাতে আমাদের ছাত্ররা বলতে না পারে বিদেশে গেলে আমরা আরো ভালো পড়তে পারব। তৃতীয়ত দরকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি ভালো ক্যাম্পাস। যেমন—ভালো ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার, খেলার জায়গা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ইত্যাদি। আমরা সে রকম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি ভালো ক্যাম্পাস করতে পেরেছি। আমাদের সব শেষে যেটা প্রয়োজন ছিল, তা হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।’

বেনজীর বলেন, “শুরুতে আমেরিকার ‘ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন’-এর মাধ্যমে আমাদের ইউনিভার্সিটির কারিকুলাম ডেভেলপ করি। ১৯৯২ সালে ১৩৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করে আজ চারটি অনুষদে ৩৬টি বিষয়ে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। বিদেশি শিক্ষার্থী পাঁচ শতাধিক, আর ১৬ জন বিদেশি শিক্ষক আছেন। কারিকুলাম আপডেটের জন্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি বোর্ড আছে। হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, মেরিল্যান্ড, জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মতো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই বোর্ডে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নোবেল বিজয়ী, দুজন নোবেল নমিনি আছেন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অ্যাক্রিডিটেশন বডির সঙ্গেও আমরা যুক্ত।”

বেনজীর আহমেদ জানান, বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তাঁদের অবস্থান এক নম্বর। এশিয়ায় ২০০-এর ঘরে। তিনি বলেন, ‘এখন এশিয়ার ১০০ ইউনিভার্সিটির মধ্যে যাওয়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের ছাত্রদের ডিগ্রি যেখানেই প্রেজেন্ট করা হোক না কেন সেটা যেন আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। আমাদের ৩০ হাজারের মতো অ্যালামনাই। তাদের অনেকে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে গুগল, আইবিএম, নাসার মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমাদের অবস্থানকে আমরা ভালো বললে হবে না, অন্যের স্বীকৃতি না হলে এটার মূল্যায়ন হয় না। নাসা, কেমব্রিজ, জন্স হপকিন্সের মতো প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাকাজ করছে। অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ের বড় বড় ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমাদের স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রগ্রাম আছে। আমাদের ছাত্ররা সেখানে এক সেমিস্টার পড়তে যায়। সেখানকার ছাত্ররাও আমাদের এখানে পড়তে আসবে।’

বেনজীর আহমেদ জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীকে তাঁরা বৃত্তি দেন। এ পর্যন্ত সর্বমোট বৃত্তির পরিমাণ ৮৫ কোটি টাকা। প্রতিবছর প্রায় ১২ কোটি টাকার বৃত্তি দেওয়া হয়। বনানীতে ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমিতে ১৫ লাখ বর্গফুট ফ্লোর স্পেসের ক্যাম্পাস। ইনডোর স্টেডিয়াম, জিম, এক হাজার ২০০ আসনের আন্তর্জাতিক অডিটরিয়াম রয়েছে। ক্যাফেটেরিয়ায় একসঙ্গে দুই হাজার শিক্ষার্থী খেতে পারে। জাতীয় শোক দিবস, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বৈশাখী উৎসব, বসন্ত উৎসব, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজন হয়। তিনি বলেন, ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি আগামী দিনে যাতে দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে, আমরা সেভাবেই এগোচ্ছি।’

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে ২৬ জন পিএইচডি শিক্ষক আছেন, যা দেশের অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি। তার পরও সরকারের নীতিমালা না থাকায় আমরা পিএইচডি দিতে পারছি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২০০ আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষক আছেন, যাঁরা পিএইচডি সুপারভাইজ করার সক্ষমতা রাখেন। আর পিএইচডি দেওয়ার সুযোগ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার আরো সুযোগ হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা