kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

যুবলীগ করেই কোটিপতি গাজী সারোয়ার!

► পুরান ঢাকায় এক মার্কেটে ১৫টি দোকান, আরো ৪০টি দখল
►যাত্রাবাড়ীতে ৫ কাঠা জমি ও ছয়তলা বাড়ি
►হাসপাতালের জায়গা দখল করে রিকশা গ্যারেজ

জহিরুল ইসলাম   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুবলীগ করেই কোটিপতি গাজী সারোয়ার!

একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা যুবলীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সারোয়ার হোসেন বাবু। তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী টেপা বাবুর মাধ্যমে। পরে সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রলীগ হয়ে আসেন যুবলীগে। এর পরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এই নেতা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাঁর নিজের মালিকানাধীন তেমন কোনো সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক তিনি।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জায়গা দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সদরঘাটসহ আশপাশের এলাকায় পিচ্চি বাবু নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন যুবলীগ নেতা সারোয়ার। তিনি থাকেন সূত্রাপুরের হেমন্ত দাস রোডে নিজের ফ্ল্যাটে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় গ্রেটওয়াল মার্কেটে গাজী সারোয়ারের নিজের ১৫টি দোকান রয়েছে। এগুলোর বাজার মূল্য অন্তত ১৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৪০টির মতো দোকান নিজের দখলে রেখেছেন এই নেতা। যাত্রাবাড়ী এলাকার ৯৬/বি কাজলা সুতিখালপাড়ে প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের ছয়তলা ভবন রয়েছে তাঁর। যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচা এলাকার দুই নম্বর গলির আফজাল মেটালের পাশে তাঁর রয়েছে পাঁচ কাঠা জমি, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।

অভিযোগ আছে, যুবলীগের এই নেতা দখলবাজি, চাঁদাবাজি আর অনিয়ম করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। টাকা ও ক্ষমতার দাপটে তিনি এখন গ্রেটওয়াল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি। সারোয়ারের বিরুদ্ধে একটি হাসপাতালের ক্রয় কমিটির সদস্য হয়ে টাকা মারা ও অন্য একটি হাসপাতালের জমি দখলের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্ব সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চঘাটের দিকে যেতে বাংলাবাজার পার হয়ে হাতের বাঁয়ে গ্রেটওয়াল মার্কেট। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বেশ কয়েকজন দোকানি আড়ালে গিয়ে কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চান। সবার সামনে কথা বললে নাকি বিপদ হতে পারে। মার্কেটের চারতলার কাপড়ের ব্যবসায়ী মিঠু মিয়া জানান, মার্কেটে সারোয়ারের অনেক দোকান থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৪০টি দোকান দখল করে নিজের মতো করে চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না।

মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, আন্ডারগ্রাউন্ডে সারোয়ারের বিশাল একটি তৈরি পোশাকের দোকান রয়েছে। দুটি দোকান একসঙ্গে করে এ দোকানটি করা হয়েছে। ওই দুটি দোকানের একটি তাঁর নিজের, অন্যটি দখল করা। নিচতলায় গিয়ে দেখা গেছে, ২৭ নম্বর দোকানটিও তাঁর দখলে। চারতলায় প্রায় ২০টি দোকানও তাঁর দখলে। এগুলোকে চার ভাগে ভাগ করে বড় দোকানের আকৃতি দেওয়া হয়েছে। দোকানগুলোর কর্মচারীরা দখল করে নেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা জানান, এখানে আগে ১৫-২০টির মতো দোকান ছিল। চারতলায় তাঁর নিজেরও রয়েছে কয়েকটি দোকান। মার্কেটের ছয়তলায় এক নারীর দোকান দখল করে মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয় করার নামে নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন।

মার্কেট ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, যুবলীগের এই নেতা মার্কেটের বিষয়ে যখন যা ইচ্ছা, তা-ই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অন্যদের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করেন না। গত কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎসহ কোনো সার্ভিসিং খরচই দেওয়া হয় না। কিছু বললে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ভয় দেখান। রমজান মাসে তাঁকে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। জাতীয় যেকোনো দিবস উপলক্ষে চাঁদা হিসেবে বিপুল টাকা তোলা হলেও তার কোনো হিসাব সমিতির অন্য সদস্যরা জানতে চাইতে পারেন না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সূত্রাপুরের প্যারিদাস রোডের ৩৩/১ নম্বর বাড়ির পাশে একটি রিকশা গ্যারেজ রয়েছে। জায়গাটি সুমনা হাসপাতালের। কিন্তু যুবলীগ নেতা গাজী সারোয়ার দখল করে রিকশা গ্যারেজ করে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। যেখান থেকে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়ে যায় তাঁর লোক। গ্যারেজের কয়েকজন টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে সুমনা গ্রুপের ম্যানেজার ফেরদৌস আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জায়গাটি যে হাসপাতালের—এটা সবার জানা। কিন্তু ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেখানে রিকশা গ্যারেজ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।’

জানা যায়, যুবলীগ নেতা সারোয়ার ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতালের ক্রয় কমিটির অন্যতম সদস্য। হাসপাতালে রোগীদের খাবার পণ্য ও মেডিক্যাল পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দ্বিগুণ দাম দেখিয়ে ভাউচার করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গ্রেটওয়াল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে গাজী সরোয়ার হোসেন বাবুকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ওই কার্যালয়ে তালা লাগানো ছিল। পরে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর ওই নম্বরে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা