kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

গাজীপুরে ব্যাপক কাটতি ক্ষতিকর ‘মিসাইলের’

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গাজীপুরে ব্যাপক কাটতি ক্ষতিকর ‘মিসাইলের’

নাম ‘হলি মুনিশ’। তবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কেউ ডাকে ‘মিসাইল’ নামে, কেউ বলে ‘ম্যাজিক বুলেট’, কেউ আবার বলে ‘একে ৪৭’। যৌন উত্তেজক এ ওষুধের চাহিদা গাজীপুরে আকাশচুম্বী। সন্ধ্যা নামলেই কিশোর, যুবক, এমনকি বৃদ্ধরাও ওষুধের দোকানে ছোটেন ‘হলি মুনিশ’ কিনতে। অনেক মুদি ও পানের দোকানেও মিলছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এ ওষুধ।

ইউনানি উপাদানে তৈরির কথা বলা হলেও বিষেশজ্ঞরা বলছেন, ‘হলি মুনিশ’ ক্যাপসুলে রয়েছে রাসায়নিক উপাদান ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’। এটি মানুষের শরীরের জন্য খুবই  ক্ষতিকর।

অভিযোগ উঠেছে ঔষধ প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রমরমা ব্যবসা করছে হলি মুনিশের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিকে ফার্মা। গাজীপুর জেলা ঔষধ প্রশাসনের দপ্তর থেকে জিকে ফার্মার দূরত্ব দেড় কিলোমিটারেরও কম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টঙ্গীর ৪৯ স্টেশন রোডে অবস্থিত জিকে ফার্মা (ইউনানি) লিমিটেড ২০১৬ সালের জুনে ঔষধ অধিদপ্তর থেকে সনদ পায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নিষিদ্ধ হলি ড্রাগসের মো. গিয়াস উদ্দিন। ২০টির অনুমোদন থাকলেও অন্তত ৭০টি ওষুধ বানায় প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে হলি মুনিশ, হলি নিশাত, মোলাডেক্স, কোর হেলথ, এরিকোমা, এরক্সিমা ও জয়সু নামের কয়েকটি ওষুধ যৌন উদ্দীপক। তবে সবচেয়ে বেশি চলে ‘হলি মুনিশ’। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রির নিয়ম না থাকলেও অবাধে বিক্রি হচ্ছে এই ওষুধ।

কী আছে হলি মুনিশে

হলি মুনিশের জেনেরিক নাম ‘কুরছ মুবাহ্হী’। ওষুধের প্যাকেটে ৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুলে শোধিত শিলাজতু, আলকুশী বীজ, ছা’লাব, লাল বামন, মোট বচ, পিপুল, অশ্বগন্ধা, জাফরান, আম্বর আশহাবসহ ১৬টি ইউনানি উপাদান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিকে ফার্মার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক হাকিম বলেন, ‘যেসব ইউনানি উপাদানের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর একটিও হলি মুনিশে নেই। অপিয়াম (অপিয়েট) নামে এক ধরনের মাদক এবং সিলডেনাফিল সাইট্রেট নামের রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে হলি মুনিশ। কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এক তোলা ইউনানি জৈব কাঁচামালও কেনা হয়নি। নেই ল্যাব, কেমিস্ট, মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, দক্ষ হাকিম কিংবা কবিরাজ।’

দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত গিয়াস উদ্দিন

গিয়াস উদ্দিন ছিলেন হলি ড্রাগসের মালিক। ইউনানি ওষুধ তৈরির সনদ নিয়ে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হলি মুনিশসহ বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরির অভিযোগে ২০১২ সালে ঔষধ অধিদপ্তর সনদ বাতিলের পাশাপাশি সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধের নির্দেশ দেয়। তার পরও গোপনে চলছিল হলি ড্রাগস। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে গিয়াস উদ্দিনকে (৫৮) দুই বছরের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে মুক্তি পেলেও ভেজাল ওষুধ তৈরির নেশা ছাড়তে পারেননি গিয়াস উদ্দিন।

২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মহাখালী ও টঙ্গী এলাকার পিনাকল সোর্সিং লিমিটেড, হলি ড্রাগস ল্যাবরেটরিজ, হলি ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড ও জিকে ফার্মায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধভাবে উৎপাদিত পাঁচ কোটি ১৬ লাখ টাকার ওষুধ জব্দ করে। চারটি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক ছিলেন গিয়াস উদ্দিন। পরে সিলগালা করা হয় কারখানা। বহু চেষ্টা করেও তিনি হলি ড্রাগসের লাইন্সেস ফেরত না পেয়ে গড়ে তোলেন জিকে ফার্মা।

গাজীপুর জেলা ঔষধ প্রশাসনের সহকারী উপপরিচালক আক্তার হোসেন জানান, জিকে ফার্মার ওষুধে ইউনানি উপাদান নেই, এটি তাঁর জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটির কয়টি ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি আছে কিংবা কয়টি উৎপাদন করছে, তা-ও তিনি জানেন না। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান তিনি।

বক্তব্য জানতে কারখানায় গেলে নিরাপত্তা প্রহরী মো. ইমান আলী বলেন, ‘স্যারদের কেউ কারখানায় নেই। তাঁদের অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না।’

কারখানার উৎপাদন কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জিকে ফার্মার অনিয়ম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসনের লাইসেন্স শাখার সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব জেলা ঔষধ প্রশাসনের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা