kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

রেলওয়ের কাজ বাগিয়ে শূন্য থেকে কোটিপতি!

নজরদারিতে রাজশাহীর দুই যুবলীগ নেতা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




রেলওয়ের কাজ বাগিয়ে শূন্য থেকে কোটিপতি!

দুজনই রাজশাহী নগরের শিরোইল এলাকার বাসিন্দা। ১০ বছর ধরে রেলওয়ের ঠিকাদারি করে আসছেন তাঁরা; শূন্য থেকে হয়েছেন কোটিপতি। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এখন দুজনই আছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে। তাঁদের সম্পদ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তাঁদের একজন হলেন মহানগর যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তৌহিদুল হক সুমন। অন্যজন হলেন যুবলীগের একই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ বাবু।

অভিযোগ রয়েছে, এই দুই নেতা পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে অথবা প্রভাব খাটিয়ে গত এক দশকে শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়েছেন, যে কাজগুলো নামকাওয়াস্তে করেই তাঁরা বিল উত্তোলন করেছেন। আবার কখনো কখনো আগেই বিল তুলে নিয়েছেন, পরে নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ করেছেন। দুজনের রয়েছে আলাদা আলিশান কার্যালয়।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সুমন ও আশরাফ বাবুর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। দুজন মিলেই রেলের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন। একসময় দুজনই মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরে ঠিকাদারি নিয়ে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হয়। সুমন ও আশরাফ বাবু রেলের সংস্কারকাজ ও মালপত্র সরবরাহের কাজই বেশি করেছেন। এর মধ্যে আশরাফ বাবু সবচেয়ে বেশি মালপত্র সরবরাহের কাজ করেছেন। এখনো রেলে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। আশরাফ বাবু সম্প্রতি রেলের বেশ কয়েকটি দপ্তরে উচ্চ মূল্যে আসবাব সরবরাহ করেছেন, যেগুলোর বাজার মূল্যের সঙ্গে সরবরাহমূল্যের আকাশ-পাতাল তফাৎ। যেমন স্টিলের ১৪ হাজার টাকার চেয়ারের মূল্য তিনি নিয়েছেন ৮২ থেকে ৮৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাউন্সিলর সুমন রাজশাহী বাস টার্মিনালে বছর পনেরো আগেও এনপি এলিগ্যান্স পরিবহনের বাসের টিকিট বিক্রি করতেন। এরপর শিরোইল এলাকায় গড়ে তোলেন নিজস্ব ‘বাহিনী’। ধীরে ধীরে বাড়ির পাশের পশ্চিমাঞ্চল রেলভবনে আধিপত্য বিস্তার করেন। শুরু করেন রেলের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ। তিনি গত ১০ বছরে অন্তত ১০০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন।

জানা গেছে, সুমনের রয়েছে রাজশাহী রেলওয়ে মার্কেটে চারটি দোকান, বাড়ি, গাড়ি ও আমবাগানসহ অগাধ সম্পদ। শিরোইল এলাকায় রয়েছে ব্যক্তিগত কার্যালয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, ক্যাসিনো-জুয়াবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসের সঙ্গে রয়েছে সুমনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আনিসের সুপারিশেই রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন সুমন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় যুবলীগের আরো দুজন নেতার সঙ্গে সুমনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। রাজশাহী রেলের ঠিকাদারিতে ওই দুই নেতার প্রভাব রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তাঁদের প্রভাবেই সুমনকে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেয় মহানগর আওয়ামী লীগ।

জানা গেছে, গত বছরের ১২ এপ্রিল যুবলীগ নেতা সমুনের একটি আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে। এর আট দিন পর ২০ এপ্রলি রাজশাহী মহানগর যুবলীগ থেকে সুমনকে বহিষ্কার করা হয়।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে যুবলীগ নেতা তৌহিদুল হক সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দুই বছর ধরে রেলওয়ের কোনো কাজ নিইনি। আমি কোনো অন্যায় করিনি। তবে রাজনৈতকিভাবে আমাকে হেয় করতে নানা অপতৎপরতা চলছে।’

মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ বাবু নগরীর ডাবতোলা হাজরাপুকুর এলাকায় ছোট্ট একটি ওষুধের দোকানের ব্যবসায়ী ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি সাইকেল নিয়ে দোকানে দোকানে প্যারাসিটামল ও স্যালাইন বিক্রি করতেন। নগরীর শিরোইল এলাকায় একটি টিনশেড বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি। ২০১২ সালের দিকে আশরাফ রেলওয়ের বড় ঠিকাদার শহিদের মাধ্যমে রেলভবনে ঢোকেন মাস্তানি করতে। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে শহিদকে কাজ পাইয়ে দিতে তিনি রেলভবনে যাতায়াত শুরু করেন। পরে নিজেই রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিনা দরপত্রে কাজ বাগিয়ে নিতে শুরু করেন। নিজের ফেসবুক পেজে রেলওয়ের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে নিজের পরিচয় উল্লেখ করেছেন তিনি।

নগরীর শিরোইল এলাকায় আশরাফের ব্যক্তিগত কার্যালয় আর আসাম কলোনি এলাকায় রয়েছে তাঁর আলিশান বাড়ি। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর সখ্য। সংগঠনবিরোধী অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় সম্প্রতি মহানগর যুবলীগ আশরাফ বাবুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।

আশরাফ বাবুর সম্পদের খোঁজে বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতার বিষয়টি তিনি কালের কণ্ঠ’র কাছে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা আমার কাছে এসেছিল। আমার যা যা আছে, আমি বলে দিয়েছি। আমি কোনো অনিয়ম করে টাকা কামাইনি। বরং মহানগর যুবলীগের সভাপতিসহ যাঁরা নানা অপকর্মে জড়িত তাঁদের বিরুদ্ধেই আমার অবস্থান।’ তাঁকে অন্যায়ভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে আশরাফ দাবি করেন, যে দপ্তর সম্পাদকের স্বাক্ষরে নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধেও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহীর একটি গোয়ন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিতর্কিত এই দুই নেতা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সেদিকে আমরা নজর রাখছি। অন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। তাঁরা গত কয়েক বছরে কিভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা