kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক বন্ধ করা উচিত

নওশাদ জামিল   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক বন্ধ করা উচিত

ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক আইন করে বন্ধ করার অভিমত দিয়েছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্ররা কয়েক দশক আগেও রাজনীতি করত আদর্শের জন্য। দেশ ও মানুষের জন্য। এখন তারা রাজনীতি করে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোই পরিচালনা করে ছাত্রসংগঠনগুলোকে। রাজনৈতিক দলের ইন্ধনেই চর দখলের মতো তারা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। এ জন্যই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদেরও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে আইন করেই ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’

ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ নানা ছাত্রসংগঠনের অপকর্মের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি করেছেন অনেকেই। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন বহুমাত্রিক মানুষ  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। রাজনীতি করা সবারই অধিকার রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ১৮ বছর পূর্ণ হলে তিনি ভোট দিতে পারবেন। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো দরকার নেই।’

ছাত্রসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া আচরণ, হত্যা-খুন, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রসংগঠনগুলো বেপরোয়া হয়ে যায় তখন, যখন তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনৈতিক দলের ইন্ধনেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রসংগঠনগুলো। আমার অভিমত হলো, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিজস্ব ছাত্রসংগঠনকে পরিত্যাগ করতে হবে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। তাদের মদদ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। পরিষ্কার বলে দিতে হবে, ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক ছিন্ন করাটা পরীক্ষিত হতে হবে। পরিষ্কার হতে হবে। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিকেও ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের সম্পৃক্ততা আইন করে বন্ধ করে দিতে হবে।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ন্যক্কারজনক নানা অপকর্ম করেছে। এখন আওয়ামী লীগের শাসনামলে ছাত্রলীগও জড়িত হচ্ছে নানা অপকর্মে। ছাত্ররাজনীতির ভেতর এখন আর আদর্শ বলে কিছু নেই। দেশ ও জাতির কল্যাণে ছাত্ররা সব সময় সোচ্চার ছিল। এখন তারা সোচ্চার টেন্ডারবাজিতে। রাজনৈতিক দলগুলো বরাবরই ছাত্রদের ব্যবহার করেছে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য। ছাত্ররা যখন দেখে তাদের সঙ্গে প্রশাসন রয়েছে, সরকার রয়েছে তখন তরুণদের বেপরোয়া আচরণ তো হবেই।’

ছাত্রসংগঠনগুলোকে স্বাধীনভাবে আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা করার আহ্বান জানিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় নয়, ছাত্রদের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা উচিত বলে মনে করি। তাদের রাজনীতি হতে হবে আদর্শিক। দেশসেবা ও মানবসেবাকে ছাত্ররা যদি আদর্শ মনে না করে, তাহলে তাদের রাজনীতি করাই উচিত নয়।’

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো রয়েছে। কিন্তু কাঠামোর ভেতর তো প্রাণ নেই। গণতন্ত্র যদি কঙ্কালসম হয়, তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হবে। বুয়েটে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেটা ভাবতেও শিউরে উঠি। আবরার ফাহাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের বিতর্ক হতে পারত। যুক্তির বদলে পাল্টা যুক্তি দেখাতে পারত ছাত্রলীগ। সেটাই গণতান্ত্রিক চর্চা। গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্রসংগঠনগুলোর ভেতরও গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। পরমতসহনশীলতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের খেলা।’

শিক্ষকদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কঠোর সমালোচনা করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, শিক্ষকরা যদি নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন, তখন ছাত্ররাও পথভ্রষ্ট হবে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি যেন স্বাভাবিক ঘটনা। একজন উপ-উপাচার্য কিভাবে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ চান? উপাচার্যদের বিরুদ্ধে পাহাড় সমান দুর্নীতির অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হন, নীতিভ্রষ্ট হন, তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকদের সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিমত প্রকাশ করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অভিভাবক হলেন উপাচার্য। উপাচার্য যদি একটি নির্দিষ্ট দলের সমর্থক হোন, তখন বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়। শিক্ষকরাও রাজনীতি করবেন। কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা উচিত নয় তাঁদের। রাজনীতি যদি করতে হয়, তাহলে শিক্ষকতা পেশা পরিত্যাগ করে সরাসরি রাজনীতি করা উচিত বলে মনে করি। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেরুদণ্ডহীন। সারাক্ষণ তাঁরা রাজনীতিবিদের দরজায় পড়ে থাকেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাঁরা উপাচার্য হলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবেই।’

ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করার নিন্দা প্রকাশ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশ্বাস করি, তাহলে ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতেই হবে। দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান। নির্বাচন হয়, ভোট হয়। সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়। কিন্তু আমরা যদি কাঠামো নিয়ে থাকি, তাহলে কিছু সমস্যা তৈরি হবে। কাঠামো কখনো আত্মা দিতে পারে না, প্রাণ দিতে পারে না। কাঠামোর ভেতর প্রাণ সঞ্চার করতে হলে সঠিক গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ থাকতে হবে। গণতন্ত্রের মূল প্রাণশক্তি হলো পরমতসহনশীলতা; ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা। যিনি ভিন্নমত পোষণ করবেন, তাঁকে সহযোগিতা করাও গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ মনে করি। জাতীয় সংসদের অনেক দল থাকবে। প্রত্যেক দলের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা থাকবে। রাজনৈতিক দলের নীতি ও আদর্শ থাকবে। প্রত্যেক দলের নিজস্ব অভিমত থাকবে, সেটাকে সম্মান করা উচিত। আমরা গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করেছি, কাঠামোর ভেতর প্রাণসঞ্চার করতে ব্যর্থ হয়েছি।’

ছাত্রসংগঠনগুলোর দীর্ঘ সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির সুনাম রয়েছে। সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের ইতিহাস রয়েছে। কয়েক দশক আগেও শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করত আদর্শের জন্য। তাদের আদর্শই ছিল দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম। তখনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। কিন্তু তারা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি নয়, লেজ হিসেবে নয়, স্বাধীনভাবেই সংগঠিত হয়ে রাজনীতি করত তারা। এখন রাজনৈতিক দলের লেজ হিসেবে কাজ করে ছাত্রসংগঠনগুলো। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তাদের পরিচালনাও করে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন সে সরকারের ছাত্রসংগঠন নানা অপকর্ম করে। কেননা তারা সরকারের প্রশ্রয় পায়, আশ্রয় পায়।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা