kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

পদার্থে তিন বিজ্ঞানীর নোবেল

নৈসর্গিক মহাজগতের তত্ত্ব আবিষ্কার

সাব্বির খান, সুইডেন থেকে   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নৈসর্গিক মহাজগতের তত্ত্ব আবিষ্কার

২০১৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেলবিজয়ী হয়েছেন তিনজন প্রতিথযশা বিজ্ঞানী। মহাবিশ্বের কাঠামো এবং ইতিহাস সম্পর্কে নতুনভাবে বোঝার এবং আমাদের সৌরজগতের বাইরে সৌর-ধরণের নক্ষত্র প্রদক্ষিণ করে এমন কোনও গ্রহের উপস্থিতির আবিষ্কার করার জন্য পুরস্কারের প্রথম অর্ধেকে পুরস্কৃত হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেমস পিবেলস এবং বাকি অর্ধেকে পুরস্কৃত হলেন সুইজারল্যান্ডের দু’জন বিজ্ঞানী মিশেল মেয়র ও দিদিইয়ার কোয়েলোজ।

দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সের স্থায়ী সেক্রেটারি জেনারেল গোরান কে. হান্সন এই তিন বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘মমহাবিশ্ব এবং যুগযুগ ধরে পৃথিবীর অবস্থানগত বিবর্তন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণে অভূতপূর্ণ অবদান রাখার জন্য এই তিন বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করা হলো’! তিনি বলেন, ‘ফিজিক্যাল বা নৈসর্গীক মহাজগতের তাত্ত্বিক আবিষ্কারের জন্য পুরস্কারের প্রথমভাগ পাবেন জেমস পিবেলস এবং মহাবিশ্বের সৌরজগতের বাইরে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এমন একটি এক্সপ্ল্যানেট বা গ্রহ আবিষ্কারের জন্য পুরস্কারের বাকি অর্ধেক যৌথভাবে পাবেন মিশেল মেয়র ও দিদিয়ার কোয়েলোজ।

১৯০১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১১২ জন বিজ্ঞানী পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছেন, যার মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী। এককভাবে পদার্থে নোবেল পেয়েছেন ৪৭ জন এবং বাকি সবগুলোই যৌথভাবে। সবচেয়ে কনিষ্ঠ বিজয়ীর বয়স ২৫ বছর এবং বয়োজ্যেষ্ঠ বিজয়ীর বয়স ৯৬ বছর। অদ্যাবধি জন বারডিন নামের একজন পদার্থবিজ্ঞানী যিনি ১৯৫৬ এবং ১৯৭২ সালে দুইবার নোবেলবিজয়ী হয়েছেন।

প্রকৃত মহাজাগতিক বিষয়ে জেমস পিবেলসের অন্তর্দৃষ্টি সমগ্র গবেষণার ক্ষেত্রকে করেছে সমৃদ্ধ এবং বিগত পঞ্চাশ বছরে ফিকশন বা কল্পনা থেকে উন্নীত বিজ্ঞানে রূপান্তরে বিশ্বতত্ত্বের যে কঠিন পথ, তার মূল ভিত্তি তিনি স্থাপন করেছেন। পিবেলসের তাত্ত্বিক অবকাঠামো ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বিকশিত হওয়া শুরু করে, যা বর্তমান মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের আধুনিক ধারণার ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়।

বিগ ব্যাং মডেল বা থিওরি মহাবিশ্বকে তার প্রথম মুহূর্ত থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পূর্বে পর্যন্ত বর্ণনা করেছিল, যখন তা ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং ঘন। সেই থেকে আমাদের মহাবিশ্বটি প্রসারিত ও বৃহত্তর হওয়ার পাশাপাশি ক্রমশ শীতল হয়ে উঠছে। বিগ ব্যাং-পরবর্তী মাত্র ৪০০,০০০ বছর পরে মহাবিশ্ব আস্তে আস্তে স্বচ্ছ হয়ে ওঠার পাশাপাশি হালকা আলোকিত স্থানের মধ্য দিয়েও ভ্রমণ করতে সক্ষম হয়েছিল। আজ অবধি সেই প্রাচীন রশ্মি বা বিকিরণটি আমাদের চারপাশে ঘিরে রয়েছে যার মধ্যে গোপনবার্তা (কোড) হিসেবে লুকিয়ে রয়েছে মহাবিশ্বের অনেকগুলি গোপনীয়তা। তার তত্ত্বীয় সরঞ্জাম ও জটিল হিসাব-নিকাশের গানিতিক ফলাফল ব্যবহার করে জেমস পিবেলস মহাবিশ্বের শৈশবকালীন সময়ের গোপন বার্তা বা কোডগুলো ব্যাখ্যা করা ছাড়াও নতুন ফিজিক্যাল বা প্রাকৃতিক প্রত্রিয়াগুলোকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। গোপনবার্তা বা কোডের ওপরে পিবেলসের গবেষনায় পাওয়া ফলাফলগুলি আমাদের এমন একটি মহাবিশ্ব দেখিয়েছে, যার মাত্র পাঁচ শতাংশ সামগ্রী বা বিষয়াদির ব্যাপারে আমরা জানতে পারি। এই পাঁচ শতাংশের মধ্যে রয়েছে গ্রহ, তারা, গাছ এবং আমাদের সৃষ্টির বর্ণনা। বাকি ৯৫ শতাংশ হচ্ছে ডার্ক ম্যাটার বা অজানা অন্ধকার পদার্থ এবং ডার্ক পাওয়ার বা অন্ধকার শক্তি, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কাছে একটি জটিল রহস্য এবং বড়ো চ্যালেঞ্জ! আইনস্টাইনের জীবদ্দশায় তিনি ডার্ক ম্যাটার এবং মহাজাগতিক ধ্রুবকের ধারণার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে, হাস্যকরভাবে তখন তিনি সেগুলোকে নিজেই নাকচ করেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন আবার জ্যোতির্বিদ্যায় সেই ধারণাগুলি ফিরিয়ে এনেছে।

১৯৯৯ সালের অক্টোবরে, মিশেল মেয়র এবং দিদিইয়ার কোয়েলোজ আমাদের সৌরজগতের বাইরে একটি গ্রহের আবিষ্কারের কথা প্রথম ঘোষণা করেছিলেন। গ্রহটি আমাদের মহাবিশ্বের সৌরজগতের বাইরে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে একটি বিশেষ ছায়াপথে প্রদক্ষিণ করছে- এমন একটি এক্সপ্ল্যানেট বা গ্রহ। দক্ষিণ ফ্রান্সের হাউট-প্রোভিন্স অবজারভেটরিতে, বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রাদি ব্যবহার করে তাঁরা সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্যাস-জায়ান্ট ‘জুপিটার’ বা ‘বৃহস্পতি গ্রহর’ সঙ্গ তুলনীয় একটি বায়বীয় বল ‘৫১ পেগাসি বি’ গ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। এই আবিষ্কারটি ছিল জ্যোর্তিবিজ্ঞানে একটি বিপ্লবস্বরূপ এবং এরপর থেকে মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথে ৪০০০ এরও বেশি এক্সপ্ল্যানেটের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। অব্যাহত রয়েছে বিভিন্ন আকার, ফর্ম এবং কক্ষপথের অবিশ্বাস্য সম্পদসহ আজব সব নতুন পৃথিবীর ধারাবাহিক অনুসন্ধান। পরিবর্তিত তত্ত্ব এবং তথ্যের দ্বারা এক্সপ্ল্যানেটসের অনুসন্ধান শুরু করার পরিকল্পনাসহ অসংখ্য প্রকল্প নিয়ে মানবসভ্যতা শেষ পর্যন্ত ভিন্ন এক জীবনে বেরিয়ে আসছি কিনা, চিরন্তন এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে গবেষণায়।

এবছরের বিজয়ীরা মহাজগত সম্পর্কে মানুষের পূর্বধারণাগুলি রূপান্তরিত করেছেন। জেমস পিবেলসের তত্ত্বীয় আবিষ্কারগুলি বিগ ব্যাংয়ের পরে মহাবিশ্ব কীভাবে বিকশিত হয়েছিল তা বোঝার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। মিশেল মেয়র এবং দিদিইয়ার কোয়েলোজের অজানা গ্রহের সন্ধান আমাদের মহাজাগতিক মহলগুলি অনুসন্ধান করে তাঁদের আবিষ্কারগুলি আমাদের চিরকালের এবং চিরচেনা মহাবিশ্বের ব্যাপারে আদি-ধারণাগুলোর আমূল পরিবর্তিত ঘটিয়েছে।

জেমস পিবেলস ১৯৩৫ সালে কানাডার উইনিপেগে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আলবার্ট আইন্সটাইন প্রফেসর অব সায়েন্স’ হিসেবে কর্মরত আছেন।

মিশেল মেয়র ১৯৪২ সালে সুইজারল্যান্ডের লসানে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯৭১ সালে সুইজারল্যান্ডের দ্য ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব জেনেভায় ‘প্রফেসর এমিরিটাস’ হিসেবে কর্তরত আছেন।

দিদিয়ার কোয়েলোজ ১৯৬৬ সালের জন্মগ্রহন করেন এবং সুইজারল্যান্ডের নাগরিক। তিনি ১৯৯৫ সালে সুইজারল্যান্ডের দ্য ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা থেকে পিএইচডি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা, সুইজারল্যান্ড এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্ব্রিজ, যুক্তরাজ্যে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত আছে।

আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে এই তিন নোবেলবিজয়ীর প্রত্যেককে একটি করে সোনার মেডেল, নোবেল ডিপ্লোম এবং ৯ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনারের প্রথম অর্ধেক জেমস পিবেলসকে এবং বাকি অর্ধেক মিশেল মেয়র ও দিদিয়ার কোয়েলোজ সমানভাগে ভাগ করে দেয়া হবে। আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টায় স্টকহোমের দ্য রয়েল ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স থেকে রসায়নবিদ্যায় নোবেলবিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা