kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারে এসওপি

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন আট রুটে

মেহেদী হাসান   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন আট রুটে

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আট নির্দিষ্ট রুটে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারবে ভারত। গত শনিবার নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে সই হওয়া ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে (এসওপি)’ নির্দিষ্ট করা এই আটটি রুট হচ্ছে—চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর থেকে আখাউড়া হয়ে আগরতলা (ত্রিপুরা), চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর থেকে তামাবিল হয়ে ডাউকি (মেঘালয়), চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর থেকে শ্যাওলা হয়ে সুতারকান্দি (আসাম), চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর থেকে বিবিরবাজার হয়ে শ্রীমন্তপুর (ত্রিপুরা), আগরতলা (ত্রিপুরা) থেকে আখাউড়া হয়ে চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর, ডাউকি (মেঘালয়) থেকে তামাবিল হয়ে চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর, সুতারকান্দি (আসাম) থেকে শ্যাওলা হয়ে চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর এবং শ্রীমন্তপুর (ত্রিপুরা) থেকে বিবিরবাজার হয়ে চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জাহাজ চলাচল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্ব) মনসুখ এল মাণ্ডব্য এই এসওপিকে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের জন্যই লাভজনক অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতিগত উদ্যোগ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে ভারতের অন্যত্র পণ্য আনা-নেয়া করার ক্ষেত্রে খরচ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ। ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পরিবহনের ক্ষেত্রে বন্দর ও রাস্তা ব্যবহারের জন্য মাসুল  পাবে বাংলাদেশ। তা ছাড়া ওই পণ্যগুলো বাংলাদেশের পরিবহন দিয়ে বন্দর থেকে ভারতীয় সীমান্তে আনা-নেয়া করতে হবে। এটি বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন খাতের জন্যও লাভজনক হবে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য মাসুল হিসেবে রাজস্ব পাবে বাংলাদেশ কাস্টমস। এসওপি বাংলাদেশে বন্দর অবকাঠামো ও লজিস্টিক সরবরাহ শৃঙ্খলা উন্নয়নে সহায়তা করবে। এসওপির ফলে বাংলাদেশের পরিবহন খাতে পণ্যবাহী যান চলাচল বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘এসওপির আওতায় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের পণ্য পরিবহনে বড় সুযোগ সৃষ্টি হবে এ দেশের বীমা শিল্পের জন্য। কারণ ভারতীয় ওই পণ্যগুলো বিমার আওতায় পরিবহন করতে হবে। এতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

এসওপি বাংলাদেশের সার্ভিস সেক্টর বিশেষ করে আর্থিক খাতের উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন। তাঁদের মতে, এটি বাংলাদেশে পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক খাতগুলোর উন্নয়নেও সহায়ক হবে।

জানা গেছে, ‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেডের (পিআইডাব্লিউটিটি)’ আওতায় নৌ প্রটোকল রুট দিয়ে আগে থেকেই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় পণ্য যাচ্ছে। সম্প্রতি সই হওয়া এসওপি বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর শিল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি ও বাণিজ্য জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ভারত এর আগে বাংলাদেশকে তার তৈরি পোশাক পণ্য কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ইউরোপের বাজারে পাঠাতে ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ দিয়েছে। সে ধরনের বন্ধুপ্রতিম উদ্যোগ হলো সম্প্রতি স্বাক্ষরিত এসওপি।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত সফরে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারে এসওপি সই হলেও এর আগে দুই দেশ ২০১৫ সালের ৬ জুন এসংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং গত বছরের ২৫ অক্টোবর একটি চুক্তি সই করে।

চুক্তি ও এসওপির আওতায় বাংলাদেশের জলপথ, রেল, সড়ক বা ‘মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট’ (জল, রেল বা সড়ক যান) ব্যবহার করে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য আনা-নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থলবেষ্টিত তিনটি ভারতীয় রাজ্য আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা—এ দেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ভারতের বন্দরগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এ দেশের রামগড় ও ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরায় সাব্রুমে ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ত্রিপুরা রাজ্যের সংযোগ স্থাপিত হবে। সাব্রুম থেকে আগরতলার দূরত্ব ১৩৫ কিলোমিটার, অন্যদিকে চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র ৭৫ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট জলপথ দিয়ে কলকাতা/হলদিয়া থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনকারী যান দুই হাজার টন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছিল। এখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের জন্য পণ্যবাহী বড় আকারের জাহাজ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ভিড়বে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ওই দেশটির অন্যান্য অংশের বাণিজ্য বাড়বে এবং পণ্য পরিবহন খরচ কমবে।

নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল, লোহা ও ইস্পাত, সার, ভোগ্য পণ্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাবে বলে ভারত আশা করছে। অন্যদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য, ফলমূল, অর্গানিক পণ্য, চা, মাছ, পাট প্রভৃতি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে জাহাজ চলাচল ও সমুদ্র খাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পিআইডাব্লিউটিটির আওতায় পাঁচটি ‘পোর্ট অব কলের’ পাশাপাশি ভারতের ধুবড়ি এবং এ দেশের পানগাঁওকে ‘পোর্ট অব কল’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। উভয় দেশই নিজ নিজ দেশে আরো ‘পোর্ট অব কল’ যোগ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সই হওয়া এমওইউ অনুযায়ী পিআইডাব্লিউটিটির আওতায় এ দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোতে নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং প্রকল্পের ৮০ শতাংশ খরচ দেবে ভারত। দুই দেশের মধ্যে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে ক্রুজ সার্ভিসও চালু হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা