kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

স্থবির প্রশাসন নড়ে আদালতের আদেশে

প্রতিকার না পেয়ে আদালতে ছুটছে নাগরিকরা

এম বদি-উজ-জামান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্থবির প্রশাসন নড়ে আদালতের আদেশে

সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সন্তানসম্ভবা নারীর অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধের জন্য ছয় মাসের মধ্যে একটি নীতিমালা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একটি মানবাধিকার সংগঠনের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এক মাস আগে এই আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবহেলার কারণে ২৬ মামলার আসামি হয়ে কারাবন্দি টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক জাহালমের কারামুক্তি মিলেছে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে।

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন বা জাহালমের কারাবন্দির বিষয়টিই শুধু নয়। নদী রক্ষা, দুধসহ খাদ্যপণ্যে ভেজাল রোধ, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার, ঢাকার বাতাস ধুলামুক্ত রাখা, যানজটমুক্ত সড়ক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা প্রদানসহ জনস্বার্থমূলক বিভিন্ন কাজ বা উদ্যোগ নিতে আদালতকেই হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার এবং বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায়ও উচ্চ আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতকে এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। ড. শাহদীন মালিকের মতে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। সে জন্য সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর সরকারের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য পৃথক আইনও করা হয়েছে, হচ্ছে। তিনি বলেন, আইন করা হয়, যাতে মানুষ সংশ্লিষ্ট কাজটি যথাযথভাবে নিয়মের ভেতরে থেকে করতে পারে। এর বাইরে গিয়ে

কোনো কিছু করতে গেলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব আইনে বলে দেওয়া আছে। কিন্তু যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইন অনুসরণ না করার কারণে বেআইনি কাজ বারবার ঘটছে। ফলে তা চলে আসছে আদালতে।

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জনজীবন ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে হাইকোর্ট ২০০১ সালে রায় দেন। কিন্তু এই রায় বাস্তবায়ন না করে প্রশাসন গড়িমসি করতে থাকে। সরকারি প্রশাসন উচ্চ আদালত থেকে বারবার সময় নিতে থাকে। এর পরও ট্যানারিশিল্প হাজারীবাগ থেকে না সরানোর কারণে ২০১৭ সালে আদালত অবমাননার মামলা করতে হয়। এর পরই হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ঠিক একইভাবে ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতকে বারবার আদেশ দিতে হচ্ছে। প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে বারবার নদী দখল হয়ে যাচ্ছে।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে, ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি প্রসূতির সিজারিয়ান প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে এর হার প্রায় ৩১ শতাংশ। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৮৩ শতাংশ এবং সরকারি হাসপাতালে এই হার ৩৫ শতাংশ। আর সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের হার বেড়েছে ৫১ শতাংশ। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেই। এ কারণেই হাইকোর্ট গত ২১ জুন এক আদেশে প্রসূতিদের অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধে ছয় মাসের মধ্যে নীতিমালা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি এসব বিষয়ে আগে থেকেই হস্তক্ষেপ করত, তাহলে আমাদের আদালতে আসতে হতো না।’

ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের গৌরব। এর দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে। সে রকম স্পর্শকাতর জায়গায় কত বড় দুর্নীতি হয়ে গেল। প্রশাসন যদি যথাযথভাবে নজরদারির মধ্যে রাখত, তাহলে সেখানে এই রকম দুর্নীতির সুযোগ থাকত না। এই দুর্নীতির খবর পত্রিকায় প্রকাশের পর তা সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনতে হয়েছে তদন্তের জন্য।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ ও বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) পরীক্ষায় দুধ, দই ও দুগ্ধজাত পণ্যে ব্যাকটেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক, সিসাসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। এ নিয়ে হৈচৈ চলছে সারা দেশে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় যথাযথ তদারকি সংস্থা বিএসটিআই দুধের নমুনা পরীক্ষা করে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দুধে আশঙ্কাজনক বা ক্ষতিকর কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি।’ সব সংস্থার পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদান ধরা পড়লেও বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় কেন ধরা পড়ছে না—এ নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলেছেন।

ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পর থেকে ১৮০ দিনের (ছয় মাস) মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ হচ্ছে না। এ কারণে হাইকোর্ট গত ১৪ জুলাই এক আদেশে আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে আদালতের দেওয়া সাত দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে বিচারকদের।

ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) থেকেই লোপাট হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছে না। এ রকম অবস্থায় সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশ দেন। এই নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপির তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছে।

এ বিষয়ে গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগসহ সকল অঙ্গ মিলেই রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করছে। তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ তার কাজ করার মাঝেও যেসব বিষয় দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছে তার কিছু কিছু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা বিচারিক দৃষ্টিতে দেখে আদালতের যে সক্রিয় ভূমিকা আমরা দেখছি তা রাষ্ট্রের সমন্বিত কাজেরই অংশ। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় যেসব সংস্থা তাদের দায়িত্ব পালনে মাঝে মাঝে শৈথিল্য দেখায়, আশা করি ভবিষ্যতে সেসব প্রতিষ্ঠান সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। আমরা আর এমন কোনো ঘটনা দেখতে চাই না, যেখানে কোনো ব্যক্তির কারণে আদালতকে কঠোর ভূমিকা রাখতে হয়। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা