kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সবিশেষ

এক শর বেশি দেশ ‘দেখলেন’ অন্ধ পর্যটক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক শর বেশি দেশ ‘দেখলেন’ অন্ধ পর্যটক

টনি জাইলস। শিশুকাল থেকেই অন্ধ ও বধির। ঘুরেছেন বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশ; যার মধ্যে বেশির ভাগ দেশ সফর করেছেন কোনো সঙ্গী ছাড়া। টনি বলছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা, ‘বিশ্বের সব কটি মহাদেশ আমি ঘুরেছি, এমনকি অ্যান্টার্কটিকাও। আমার লক্ষ্য হলো বিশ্বের সব কটি দেশ ভ্রমণ করা।’

ইথিওপিয়া সফরের সময় বিবিসির ‘ট্রাভেল শো’কে সাক্ষাৎকার দেন ৪১ বছর বয়সী এই ইংলিশ ভ্রমণকারী। তাঁর ভাষায়, ‘কেউ কেউ হয়তো বলবেন আমি ভ্রমণের চূড়ান্ত ধাপের উদাহরণ। তাঁদের আমি দেখাতে চাই যে আপনি বিকল্প পন্থায়ও বিশ্বকে দেখতে পারেন। আমি মানুষের কথা শুনি, পাহাড়ে উঠি—সব কিছু আমি আমার স্পর্শ ও পায়ের মাধ্যমে অনুভব করি। এভাবেই আমি একটি দেশ দেখি।’

টনি ২০ বছর ধরে নতুন নতুন জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন। সে রকমই একটি সফরের সময় তিনি তাঁর গ্রিক বান্ধবীর সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি নিজেও অন্ধ। গত বছর বান্ধবীর সঙ্গে রাশিয়া গিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম দেশটির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ট্রেন দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁরা। তবে বেশির ভাগ ভ্রমণে টনি একাই ঘুরে বেড়িয়েছেন।

টনির ভ্রমণের অর্থ জোগাড় হয় তাঁর বাবার পেনশনের টাকা থেকে। কাজেই আগে থেকেই যথেষ্ট পরিকল্পনা করে ভ্রমণসূচি ঠিক করেন তিনি। প্লেনের টিকিট কাটার ক্ষেত্রে তাঁর মা তাঁকে সাহায্য করেন। কারণ টনির মতে, বেশির ভাগ এয়ারলাইনস কম্পানিতে অন্ধদের জন্য যথেষ্ট সুবিধা নেই। কোনো দেশে থাকার সময় যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেন, তাঁদের সঙ্গে আগেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে নেন তিনি। টনি বলছিলেন, ‘আমি কোনো বই বা ট্রাভেল গাইড দেখে ঠিক করতে পারি না যে একটি দেশের কোথায় কোথায় আমি যাব। ওই তথ্যগুলো ভ্রমণের আগেই জানতে হয় আমাকে। তাই আমি আগে থেকেই আমার সূচি ঠিক করে নিই।’

একবার নতুন কোনো দেশে পৌঁছানোর পর সেখানে ভ্রমণের বিষয়টি রোমাঞ্চ জাগায় তাঁর মধ্যে। টনির ভাষায়, ‘মাঝেমধ্যে আমি জানি না যে কার সঙ্গে আমার পরিচয় হবে বা কী হতে যাচ্ছে। আমার কাছে সেটিই অ্যাডভেঞ্চার।’

টনির যখন ৯ মাস বয়স তখন তাঁর চোখের সমস্যা প্রথম ধরা পড়ে। ১০ বছর বয়সে তাঁর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এর আগে তিনি আংশিক বধির হিসেবে চিহ্নিত হন। বর্তমানে কানে শোনার জন্য শক্তিশালী ডিজিটাল হিয়ারিং এইড ব্যবহার করলেও সব ধরনের শব্দ শুনতে পারেন না। তিনি একটি বিশেষ স্কুলে পড়ালেখা করেন এবং সেই স্কুল থেকেই ১৬ বছর বয়সে প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণ করেন। এখনো মাঝেমধ্যে নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন টনি। ২০০৮ সালে কিডনিতে সমস্যা দেখা দিলে তাঁর কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়।

১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারান টনি। ১৬ বছর বয়সে হারান তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে, যিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। টনি বলেন, ‘ওই ঘটনার পর ছয়-সাত বছরের জন্য আমি মদে আসক্ত হয়ে পড়ি। ২৪ বছর বয়সের মধ্যে আমি পুরোপুরি অ্যালকোহলিক হয়ে যাই।’

টনির বাবা সওদাগরি জাহাজে কাজ করতেন। শিশু বয়সে বাবার কাছ থেকে শোনা দূরদেশের গল্প টনির মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে। টনি বলছিলেন, ‘যখন মদের নেশা থেকে আরোগ্য লাভ করি তখন দেখতে পাই যে সম্পূর্ণ নতুন রাস্তায় জীবন চালানোর সুযোগ আছে।’

বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোর সময় টনি সেসব অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করেন। সংগীত তাঁর সবচেয়ে পছন্দের বিষয়গুলোর একটি। সংগীতের মধ্যে তিনি নিজেকে খুঁজে পান। তাঁর মতে, সংগীত সব বাধা অতিক্রম করতে পারে।

সব অঞ্চলের স্থানীয় খাবার খাওয়াও টনির ভ্রমণের অন্যতম লক্ষ্য থাকে। তিনি অনেক দর্শনীয় জায়গায় গিয়েছেন এবং অনেক জায়গার ছবিও তুলেছেন। সেসব ছবি টনি নিজে হয়তো উপভোগ করতে পারেন না, তবে তাঁর ওয়েবসাইটগুলোতে দর্শকরা সেসব ছবি দেখে বিশ্বের নানা জায়গা সম্পর্কে জানতে পারে। অনেক সময় মানুষ তাঁর ভ্রমণের নেশা দেখে অবাক হয়ে যায়। তারা জিজ্ঞেস করে, একজন অন্ধ ব্যক্তি কেন পৃথিবী ঘুরে দেখতে চাইবে? টনির উত্তরটা কিন্তু খুবই সহজ, ‘কেন নয়?’ সূত্র : বিবিসি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা