kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

রেলওয়ের জমি দখল করে পাকা ভবন তুলছেন আ. লীগ নেতারা

কাঁকনহাট প্যারামেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড বঙ্গবন্ধু অলটারনেটিভ হোমিও হাসপাতালের নামে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রেলওয়ের জমি দখল করে পাকা ভবন তুলছেন আ. লীগ নেতারা

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট স্টেশনের কাছে রেলওয়ের জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাটে রেলওয়ের জমি দখল করে পাকা ভবন তুলছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাঁকনহাট প্যারামেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড বঙ্গবন্ধু অলটারনেটিভ হোমিও হাসপাতালের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় সাত কাঠা পরিমাণের এ জমির মূল্য অন্তত দুই কোটি টাকা। এরই মধ্যে খবর পেয়ে তাঁরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দখলের সত্যতা পেয়েছেন। ভবন নির্মাণের কাজও বন্ধ করে দিয়েছেন। পাশাপাশি গোদাগাড়ী থানায় চারজনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ সেটি গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি।

জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ভূ-সম্পদ বিভাগের ফিল্ড কানুনগো মহসিন আলী গত মঙ্গলবার এ অভিযোগটি দায়ের করেন।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তাঁরা হলেন কাঁকনহাট পৌর শাখা আওয়ামী লীগের সদস্য মিলন (৩২), ৭ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সভাপতি বকুল (৩৫), ৩ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সদস্য মইদুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম। এই চার নেতা ও তাঁদের লোকজন মিলে রেলওয়ের জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।

ওই অভিযোগের একটি কপি গতকাল কালের কণ্ঠ’র হস্তগত হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগের কথা আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, রেলওয়ের জায়গা দখল করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই চার নেতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে গেলে তাঁরা নিজেদের লোকজন নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ভূ-সম্পদ বিভাগের ফিল্ড কানুনগো মহসিন আলীকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। বাধ্য হয়ে মসহিন আলী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আসেন। এরপর তিনি থানায় গিয়ে এই চারজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।

জানতে চাইলে মহসিন আলী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁরা (আওয়ামী লীগের চার নেতা) রেলওয়ের জায়গা দখল করে ভবন গড়ে তুলছেন। এটি তাঁরা করতে পারেন না। প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের (প্রায় সাত কাঠা) ওই জায়গা দখল করে নিয়েছেন তাঁরা। যার আনুমানিক মূল্য দুই কোটি টাকা। সেই জায়গাটি উদ্ধারে আমরা এরই মধ্যে উচ্ছেদ অভিযানের প্রক্রিয়াও হাতে নিয়েছি। পাশাপাশি থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মামলা রেকর্ড করা হয়েছে কি না বলতে পারব না।’

গতকাল সকালে সরেজমিনে কাঁকনহাট গিয়ে দেখা যায়, রেলওয়ে স্টেশনের উত্তর পাশে রেলওয়ের ওই জমিটি দখল করে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। প্রাচীরের অন্য পাশে চলছে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ। এরই মধ্যে ছাদ ঢালাইও হয়ে গেছে। কিন্তু গত দুই দিন ধরে কাজ বন্ধ আছে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। তাঁরা জানান, নির্মাণাধীন ওই ভবনের পাশের রাস্তার উল্টো দিকের একটি ভবনে কাঁকনহাট প্যারামেডিক্যালের ক্যাম্পাস ছিল। এখন সেখান থেকে নতুন ভবনে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। কাঁকনহাট পৌর শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বেই ওই জায়গাটি দখল করা হচ্ছে। তাঁর ইন্ধনেই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতারা জোর করে জায়গাটি দখল করে সেখানে নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো তাঁদেরকেও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে তাঁরা পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এরপর গত সোমবার জিএম হারুন-অর-রশিদ নিজে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা পান। এরপর তাঁর নির্দেশে কাজ বন্ধ করে দেয় রেলওয়ের ভূ-সম্পদ বিভাগ।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম হারুন-অর-রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেলওয়ের বিশালাকার সম্পত্তি দখল করে সেখানে পাকা ভবন তৈরি করা হচ্ছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না। আমি দ্রুত এই ভবন উচ্ছেদের জন্য নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জমি দখলকারী আওয়ামী লীগ নেতা ও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক মইদুল ইসলাম কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেন, ‘জায়গাটির কিছু অংশ আমরা রেলওয়ে থেকে কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য লিজ (ইজারা) নিয়েছি। আর কিছু অংশ এখনো রেলওয়েরই আছে। সেই জায়গায় ভবন করা হচ্ছে। এখানে জোর করে দখলের বিষয়টি সঠিক নয়। রেলওয়ে চাইলে আমি আমার প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিব।’

পৌর শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি ওই জায়গা দখলের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। কারা করেছে বলতে পারব না।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা নূরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লিজের বিষয়টি জানা নেই। তাঁরা জোর করে জায়গা দখল করে এখন লিজের কথা বলছেন। তবে রেলওয়ের সম্পত্তি লিজ নিলেও সেখানে পাকা ভবন করার কোনো অধিকার দেওয়া থাকে না। অস্থায়ী ভবন গড়ে তোলার শর্ত দেওয়া হয়। যদি তাঁরা রেলওয়ের জমির কিছু অংশ লিজ নিয়েও থাকেন, তাহলে সেই শর্তটিও লঙ্ঘন করেছেন। কাজেই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা