kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

খুলনা বিএনপির রাজনীতি

আদালতে হাজিরা দিয়েই দিন যায় নেতাকর্মীদের

আ. লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেন বড় নেতারা

তৈমুর ফারুক তুষার ও কৌশিক দে, খুলনা থেকে   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আদালতে হাজিরা দিয়েই দিন যায় নেতাকর্মীদের

মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আদালতে চক্কর কাটতেই দিন যায় খুলনা বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী এবং জেলা ও মহানগর কমিটির তুলামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ নেতারা একেকজন ডজন ডজন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। ফলে প্রায় প্রতিদিনই আদালতের বারান্দায় তাঁদের চক্কর কাটতে হয়। তবে মামলা ও জেল-জুলুম থেকে বাঁচতে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেন খুলনা

জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এ কারণে জেলা ও মহানগরের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের নামে মাত্র কয়েকটি মামলা রয়েছে।

খুলনা জেলা ও মহানগর কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একদিকে জেলা ও মহানগরের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সখ্য, অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর প্রশাসনের মামলা, হামলা, জুলুমের কারণে খুলনায় তেমন কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই বিএনপির। কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিগুলো দায়সারা পালন, নানা দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পেশ ও মানববন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে বিএনপির কর্মকাণ্ড। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জনমত গঠন, কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন অনেক দূরে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে খুলনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে ১১০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিগত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও এরপরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ৪৪টি মামলা হয়। নগরীর আট থানায় দায়ের করা এসব মামলায় দুই হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। সম্প্রতি এ মামলাগুলোর (৪৪টি) অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়েছে। গত বুধবার মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করে বিএনপি।

খুলনা জেলা ও মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ৪৪টি মামলায় নতুন করে অভিযোগপত্র দেওয়ায় এ মামলার দুই হাজারের বেশি আসামিকে এখন আবার নতুন করে জামিন নিতে হবে। এরপর দেখা যাবে প্রতি মাসেই আদালতে হাজিরার তারিখ থাকবে। এ ছাড়া পুরনো ৬০টির বেশি মামলায়ও বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়মিত আদালতে হাজির হতে হবে। ফলে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পালন ও আন্দোলন সংগঠিত করার সময় পাওয়াই তো আমাদের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন গণহারে ও গায়েবি মামলা কখনো দেওয়া হয়নি।

খুলনা জেলা ও মহানগর বিএনপির কার্যালয় সূত্র জানায়, খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ৬৭টি, খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান আরিফ অন্তত ৬০টি, মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম ৪০টি, মহানগর বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও সোনাডাঙ্গা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মুরাদ ৩৬টি, মহানগর বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম তুহিন ২৬টি মামলার আসামি।

মহানগর যুবদলের সভাপতি মাহবুব হাসান পিয়ারু ৩২টি, খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি শরিফুল ইসলাম বাবু ৩০টি মামলার আসামি। এ রকম আরো কয়েক শ নেতাকর্মীর নামে অসংখ্য মামলা রয়েছে। এসব নেতাকর্মীর অনেককেই মাসের অর্ধেক দিন আদালতে যেতে হয়।

তবে মামলার দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। ২০০৮ থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক আমির এজাজ খানের বিরুদ্ধে ছয়টি করে, খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধেও ছয়টি এবং সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন এক-দুইবার করে জেল খাটলেও এখনো জেলে যেতে হয়নি মঞ্জুকে।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কালের কণ্ঠকে জানান, জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য থাকার কারণে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার দিকে মন নেই নেতাদের। বিগত ১০ বছরেও খুলনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

খুলনা বিভাগ বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিরোধী দলের কাজই হচ্ছে জনস্বার্থ নিয়ে কথা বলা। তবে বিএনপি সব কথা বলতে পারছে না। এখানে নেতৃত্বের কিছুটা সমস্যা আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন দীর্ঘদিন ধরে জেলে আছেন। ফলে কেন্দ্রীয় কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ায় আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশাও তৈরি হয়েছে।’

নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করে মঞ্জু বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে বিএনপির দুর্বলতা আছে। বিএনপি এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো আগের সেই শক্তি নিয়ে নামতে পারছে না। ফলে আমরা জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারছি না।’

কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রশাসনের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে জানিয়ে মঞ্জু বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের প্রতিদিন কোর্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখন আমরা কোর্টে থাকব, নাকি রাজনীতিতে থাকব সেটারই তো কূলকিনারা করতে পারছি না।’

মহানগর ও জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, ‘দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবেই। জেলার সঙ্গে মহানগরের কিছুটা দূরত্ব ছিল। তবে এখন তা অনেক কমে এসেছে। একসঙ্গে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে না।’

খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগ থেকে রাজনীতি করছি। কিন্তু এমন দমন-পীড়নের সরকার কোনো দিন দেখিনি। আমাদের নেতাকর্মীদের নামে অসংখ্য মামলার কারণে খুলনায় বিএনপির কর্মকাণ্ড সেভাবে করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন আমাদের নেতাকর্মীরা আদালতে ছুটছে।’

খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আমাদের বিশেষ কোনো সখ্য নেই। তবে খুলনার রাজনীতিতে আমরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চর্চা করি। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, যেমন—বিয়ে বা মিলাদ এসবে দেখাসাক্ষাৎ হলে কথা বলি, ওটুকুই। এটুকু শিষ্টাচার আছে বলেই কিছুদিন আগে আমরা হাদিস পার্কে আমাদের বিভাগীয় সমাবেশ করতে পেরেছি। এর পাশেই কিন্তু আওয়ামী লীগ কার্যালয়। আসলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক আঁতাত দুটো ভিন্ন জিনিস। এটা অনেকেই বুঝতে পারেন না।’

খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির এজাজ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সংগঠন গোছানোর কাজ পুরোদমে শুরু করেছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা