kalerkantho

আলভীর ছাড়পত্রে ট্রমা সেন্টারের তাড়াহুড়া

ওমর ফারুক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আলভীর ছাড়পত্রে ট্রমা সেন্টারের তাড়াহুড়া

হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিলেও আলভী এখনো শয্যাশায়ী। গতকাল সন্ধ্যার পর তাঁর বাড়ির বিছানা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভিক্টর পরিবহনের বাসের ধাক্কায় নিহত সংগীত পরিচালক পারভেজ রবের ছেলে একই পরিবহনের বাসচাপায় গুরুতর আহত ইয়াসির আলভীকে ট্রমা সেন্টার থেকে গতকাল বুধবার বিকেলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ভর্তি হওয়ার চার দিনের মাথায় তাঁকে এভাবে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না স্বজনরা। তাঁদের অভিযোগ, আলভীকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রমা সেন্টার কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেছে, তাঁর চিকিৎসা বাসায় রেখেই করা সম্ভব বলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাসায় এনে ছেলেকে নিয়ে ভয়ে আছেন আলভীর মা রুমানা সুলতানা। ছেলের কিছু হলে তিনি একা কী করবেন, সেটা ভেবে খুবই হতাশ তিনি।

এর আগে গতকাল সকালে ট্রমা সেন্টারে আলভীকে দেখতে যান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ ও ট্রমা সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক। তথ্যমন্ত্রী আলভীর চিকিৎসা বিনা খরচে করার জন্য আ ফ ম রুহুল হককে অনুরোধ করেন। ডা. রুহুল হক ব্যবস্থা করবেন বলে তথ্যমন্ত্রীকে কথা দেন।

গত বৃহস্পতিবার ভিক্টর পরিবহনের বাসের ধাক্কায় নিহত হন আলভীর বাবা সংগীত পরিচালক পারভেজ রব। তাঁর কুলখানির বাজার করতে গিয়ে গত শনিবার রাতে সেই ভিক্টর পরিবহনের বাসের ধাক্কায়ই নিহত হয়েছেন তাঁর ছেলের বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন। গুরুতর আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে আলভী রব। বাসচাপায় আলভীর কোমর ভেঙে গেছে। তাঁর ডান হাতের একটি আঙুলও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আলভীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকে গত রবিবার তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে। হাসপাতালটির ষষ্ঠ তলার ১২ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ছিলেন আলভী। চার দিন সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আলভী বিছানায় শুয়ে শুধু মুখ ও হাত নাড়াতে পারেন। কোমর ভেঙে যাওয়ায় পুরো শরীর নাড়ানোর ক্ষমতা তাঁর নেই।

আলভীর মা রুমানা সুলতানা জানান, গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ট্রমা সেন্টার কর্তৃপক্ষের কথায় আলভীকে পাঁচ-ছয়জনে ধরে একটি অ্যাম্বুল্যান্স তুলে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু ছেলেকে এখনই বাসায় নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না তাঁর। তিনি জানান, ডাক্তাররা বলেছেন, বাড়িতেই বিশ্রামে রাখতে। তাঁরা ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। সেই ওষুধ কিনতে চলে গেছে দুই হাজার টাকা। আর ছেলের জন্য বেড কিনতে খরচ হয়েছে তিন হাজার টাকা। অ্যাম্বুল্যান্সের খরচ দিতে হয়েছে দুই হাজার টাকা। ট্রমা হাসপাতালে ভর্তির সময় ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। এরপর নাকি ১২ হাজার টাকা বিল হয়েছে। সেই টাকা দিতে হয়নি।

রুমানা বলেন, ‘টাকা দিতে হয়নি, তবে আলভীকে হাসপাতালে রাখাও হয়নি। এখন ছেলের কোনো সমস্যা হলে আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না। সে তো জটিল রোগী। কিছু খেতে পারছে না। মুখে কিছু দিলেই সে বলে বুকে ব্যথা পাচ্ছে।’ এ অবস্থায় আলভীকে ট্রমা সেন্টার থেকে বাড়ি পঠিয়ে দেওয়ায় তিনি খুবই হতাশায় ভুগছেন। রুমানা বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বলেছে বাড়িতে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে কে তাকে দেখবে। এখানে তো কোনো চিকিৎসক নেই। এ ছাড়া কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে সে বিষয়েও তো আমরা কিছু জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার স্বামী রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। এখন কোনো গার্ডিয়ান নেই। এমন গুরুতর অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে আমি কী করব, কোথায় যাব ভেবে পাচ্ছি না।’

রুমানা জানান, ভিক্টর পরিবহনের কেউই এখন পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

আলভীকে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রমা সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর মো. হান্নান মল্লিক গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তার যে কন্ডিশন তাতে বাসায় থেকেই চিকিৎসা সম্ভব বলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। হাসপতালে থাকলেও শুয়ে থাকতে হবে দুই-তিন সপ্তাহ। বাড়িতে থাকলেও শুয়েই থাকবে। তাই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কোমরের দিকে যে হাড় ভেঙেছে সেগুলো জটিল নয়। জোড়া লেগে যাবে।’

এদিকে গতকাল সকাল ১১টার দিকে ট্রমা সেন্টারে আলভীকে দেখতে যান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ। তিনি চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে ৫০ হাজার টাকা দেন আলভীকে। সেখান থেকে বেরিয়ে হাছান মাহ্মুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু দানবরূপী চালককে রুখতেই হবে। প্রথমত শিল্পী পারভেজ রবকে যেভাবে চাপা দেওয়া হয়েছে, পরে তাঁর ছেলে একই কম্পানির গাড়ির ধাক্কায় যেভাবে আহত হয়েছে—দুটিই দুর্ঘটনা কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে। আমি মনে করি, অসচেতনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে মানুষের মৃত্যু শুধু দুর্ঘটনা নয়, কিছু খুনের ঘটনা। সুতরাং এগুলোর লাগাম টানতেই হবে।’

অন্যদিকে পারভেজ রব নিহত হওয়ার ঘটনায় তুরাগ থানায় দায়ের করা মামলায় গতকাল পর্যন্ত বাসের চালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তুরাগ থানার ওসি নূরুল মুত্তাকীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসচালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারিনি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভিক্টর পরিবহনের যে বাসটি জব্দ করা হয়েছে সেটি নেওয়ার জন্য কেউ এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’

মন্তব্য