kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

মিয়ানমার বাহিনীকে জাতিসংঘ তদন্ত কাঠামো প্রধানের হুঁশিয়ারি

সব দেখছি, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করবই

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বললেন রোহিঙ্গাদের ফেরা এখন আরো কঠিন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সব দেখছি, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করবই

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামোর প্রধান নিকোলাস কোমজিয়ান। গতকাল সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪২তম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর তদন্তকাঠামোর প্রথম প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি ওই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর উদ্দেশে বলতে চাই—আমরা সব দেখছি। আমরা অপরাধের বিচার নিশ্চিত করবই।’

জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দল গত বছর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর অপরাধ সংঘটনের তথ্য দিয়ে অপরাধীদের বিচারের সুপারিশ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামো গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো একদিন উপযুক্ত কোনো দেশীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের অপরাধীদের বিচারের জন্য ওই কাঠামো প্রস্তুতি নেবে।

নিকোলাস কোমজিয়ান বলেন, গত ৩০ আগস্ট তদন্তকাঠামোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী মিশন এ পর্যন্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে সেগুলো মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামোর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া গত ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারের যে কোনো স্থানে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা মিয়ানমারবিষয়ক আন্তর্জাতিক তদন্ত কাঠামোকে দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোর কোনো মেয়াদ নির্দিষ্ট নেই। তাই আজ বা আগামীকাল যেসব অপরাধ হচ্ছে সেগুলোও তদন্ত করার ক্ষমতা এই কাঠামোর আছে।

তদন্তকাঠামোর প্রধান বলেন, মিয়ানমারের অপরাধীদের বিচারের জন্য মামলার প্রস্তুতি নিতে এই তদন্তকাঠামো সৃষ্টির ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৯ বছর ধরে তিনি বসনিয়া, সিয়েরা লিওন, পূর্ব তিমুর ও কম্বোডিয়ায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। অপরাধ সংঘটনের অনেক বছর পরও বিচারের নজির আছে। তিনি বলেন, সব অপরাধের অভিযোগের বিচার করা এই তদন্তকাঠামোর পক্ষে সম্ভব হবে নয়। এ জন্য বেছে বেছে কিছু অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, অপরাধ যে সংঘটিত হয়েছে তা প্রমাণ করা, অপরাধীদের নিন্দা জানানো এবং কিছু ঘটনার বিচার করা তাঁর তদন্তকাঠামোর লক্ষ্য।

মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাধগুলোর তদন্ত ও বিচারে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন নিকোলাস কোমজিয়ান। আগামী মাসগুলোতে বেশ কিছু দেশ সফর করে সম্ভাব্য অপরাধী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে : অধিবেশনের শুরুতে মানবাধিকার পরিষদের সামনে বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার সময় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাচেলেত বলেন, মিয়ানমার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও যৌন সহিংসতাসহ ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশছাড়া করার পর দুই বছর পার হয়েছে। এখন রাখাইন রাজ্য তথাকথিত আরাকান আর্মি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘাত এবং আরেক দফা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাস্তুচ্যুতি দেখছে। এর ফলে রাখাইন ও রোহিঙ্গা—উভয় নৃগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়ছে। এটি আশ্রিত রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের ভেতর অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের ফিরে যাওয়া আরো কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, শান ও কাচিন রাজ্যেও বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। মানবাধিকার পরিষদের এবারের অধিবেশনে সত্যানুসন্ধানী মিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উঠবে। মিয়ানমারজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরার জন্য তিনি ওই মিশনকে ধন্যবাদ জানান।

কাশ্মীর নিয়ে উদ্বেগ : কাশ্মীর প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, তাঁর দপ্তর নিয়ন্ত্রণরেখার উভয় পাশেই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য পাচ্ছে। কাশ্মীরি নেতাকর্মীদের আটক, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগে বিধিনিষেধ আরোপসহ কাশ্মীরি জনগণের মানবাধিকার নিয়ে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গভীর উদ্বেগ জানান। 

ভারত, পাকিস্তান—উভয় দেশের সরকারকে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান মিশেল বাচেলেত। বিশেষ করে, তিনি ভারত সরকারকে চলমান আটকাবস্থা বা কারফিউ শিথিল করার পাশাপাশি জনগণের মৌলিক সেবাগুলো পাওয়ার সুযোগ এবং আটকদের আইনি সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরের জনগণের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব পড়ে এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।’

আসামে ‘রাষ্ট্রহীনতা’ ঠেকানোর আহ্বান : ভারতের আসাম রাজ্যে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস, (এনআরসি) বা নাগরিক তালিকা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, গত ৩১ আগস্ট আসামে প্রকাশিত এনআরসিতে ১৯ লাখ লোক বাদ পড়ায় ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপিলের সময় যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং তাদের আটক বা বহিষ্কার ঠেকাতে ও ‘রাষ্ট্রহীনতা’ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি ভারত সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা