kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবিনে টিআইবি

৫০ লাখ টাকাও লেনদেন সাবরেজিস্ট্রার বদলিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৫০ লাখ টাকাও লেনদেন সাবরেজিস্ট্রার বদলিতে

সাবরেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বদলির জন্য একজন সাবরেজিস্ট্রারকে গুনতে হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া এলাকা ও জমি নিবন্ধনের সংখ্যা যে অফিসে বেশি সে অফিসে বদলির জন্য লেনদেনের পরিমাণও বাড়ে। ‘ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

টিআইবি জানিয়েছে, গবেষণা সম্পন্ন করতে প্রথম পর্যায়ে আটটি বিভাগ থেকে ১৬টি জেলার রেজিস্ট্রার অফিস নির্বাচন করা হয়। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৬টি জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের আওতাধীন মোট ৪১টি সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে তথ্য নিয়ে গুণগত গবেষণাটি করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য মতে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেখেই জমির দলিল নিবন্ধন করা হয়। সাবরেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত অফিসে যান না। সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অবৈধ অর্থের লেনদেন চলে রাত পর্যন্ত। এ ছাড়া দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে থাকে। নকলনবিশদের নিয়োগ, দলিল লেখকদের লাইসেন্স দেওয়া থেকে শুরু করে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের  বেশির ভাগ কাজ হয় রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে। নকলনবিশদের কাজে যোগদানের জন্য ২০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। নকলনবিশ থেকে মোহরার পদে যোগদানের জন্য দুই থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। মোহরার থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির জন্য তিন থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় বলে জানিয়েছে টিআইবি। এক থেকে তিন লাখ টাকা না দিলে দলিল লেখক হিসেবে নিবন্ধন করা যায় না বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ভূমি খাতে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। এসব পদক্ষেপের পরও সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে লেনদেন, দলিল লেখকদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সাবরেজিস্ট্রার বদলিতে নিয়মবহির্ভূত লেনদেনসহ বেশ কিছু অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া সাবরেজিস্ট্রার অফিসে সেবা পাওয়া খুব দুরূহ বিষয়। টিআইবির মতে, দলিল লেখার ফি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা না থাকায় অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে থাকেন দলিল লেখকরা। অতিরিক্ত ওই ফি দলিল লেখক সমিতি ও সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ পেয়েছে টিআইবি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ভূমির দলিল নিবন্ধন সেবায় সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো খাতটিতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। এখনো নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের জন্য সেবাগ্রহীতাদের এক রকম জিম্মি করে রাখা হয়। যোগসাজশ ও অংশীদারির ভিত্তিতে দুর্নীতি হওয়ার কারণে তার লাগাম টানা যাচ্ছে না।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতি লাখে এবং প্যাকেজ আকারে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে দলিল নিবন্ধন করা হয়। দলিল নিবন্ধনের ধরনভেদে দলিলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতি লাখে ১-৩ শতাংশ হারে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ। এ ছাড়া দলিল লেখকরা ‘অফিস খরচের’ নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। জমির দলিল নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে গ্রাহকদের কাছ থেকে আরো বেশি অর্থ নেওয়া হয়। এ ছাড়া এলাকা ও জমির মূল্যভেদে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ কম-বেশি হয়। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পেয়েছে টিআইবি। আবার সেবাগ্রহীতা, দলিল লেখক এবং সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জমির বাস্তব মূল্য না দেখিয়ে কম দেখানো হয়। এতে সরকারি নিবন্ধন ফি ফাঁকি দিয়ে সেবাগ্রহীতা ও অসাধু কর্মকর্তারা লাভবান হন। এ ছাড়া ফি কমানোর জন্য পরিবর্তন করা হয় নিবন্ধনের ধরন। স্বাক্ষর জাল করে এবং ভুয়া মালিককে সাবরেজিস্ট্রারের সামনে হাজির করে একজনের জমি অন্যজনের নামে লিখে দেওয়ার অভিযোগও পেয়েছে টিআইবি।

টিআইবি জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীনে ৩৬ লাখ ৭২ হাজার ৪২৮টি জমির দলিল নিবন্ধিত হয়েছে। ওই অর্থবছরে সরকার রাজস্ব আয় করেছে ১২ হাজার ৪৩২ কোটি ৯৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৩১ টাকা। রাজস্ব আয়ের দিক থেকে খাতটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও জনবল, লজিস্টিক, বাজেট ও অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা