kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে গবেষক ফিরোজ নিহত

গাজীপুরে স্বজনদের আহাজারি

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর ও জাবি প্রতিনিধি   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে গবেষক ফিরোজ নিহত

আগামী ডিসেম্বরে দেশে আসার কথা ছিল ছেলে ফিরোজ উল আমিনের। কিন্তু চলে আসছেন তিন মাস আগেই। এ খবরে মা ও স্বজনদের খুশি হওয়ার কথা থাকলেও তাঁর গাজীপুর মহানগরীর ইটাহাটার বাড়িতে চলছে উল্টো চিত্র। চলছে আহাজারি। কারণ ছেলে বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডাকাতের গুলিতে নিহত হয়েছেন ফিরোজ উল আমিন (২৯)। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ব্যাটন রউজ এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশির মালিকানাধীন একটি গ্যাস স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক এই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক গোল্ডেন জি রিচার্ডের অধীনে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর বিশেষায়িত বিষয় ছিল সাইবার সিকিউরিটি।

গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ফিরোজের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ অঝোরে কাঁদছেন, কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন। একমাত্র ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন মা ফেরদৌসী আমিন। ভগ্নিপতি মো. তালিম হোসেন জানান, ফিরোজের ডাকনাম রিয়েল। বন্ধুমহল ও এলাকার মানুষ তাঁকে ওই নামেই চেনে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। ছিলেন খুবই মেধাবী। জাবি থেকে ২০১৩ সালে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে স্কলারশিপ নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার সিকিউরিটির ওপর পিএইচডি করতে যান। বিদেশ যাওয়ার তিন মাসের মাথায় তাঁর বাবা রুহুল আমিন মারা যান। বহু দূরে থাকলেও মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো রিয়েলের। সর্বশেষ শুক্রবার বিকেলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়। একা থাকতে ভালো লাগে না জানিয়ে মা রিয়েলের জন্য বিয়ের পাত্রী দেখা শুরু করেন। তাড়াতাড়ি দেশে আসতেও বলেন। জবাবে মাকে পাত্রী ঠিক করতে বলেন। ডিসেম্বরে দেশে এসে বিয়ে করে আবার চলে যাবেন বলেও জানান। তাঁর দেশে আসার খবরে পরিবারে বইছিল আনন্দের বন্যা। বইছিল বিয়ের আমেজ। গবেষণার পাশাপাশি বিয়ের খরচ জোগাতে স্থানীয় লুইজিয়ানার একটি গ্যাস ইস্ট ব্যাটন রুজে বাংলাদেশির মালিকানাধীন মি. লাকিস ভ্যালারো গ্যাস স্টেশনে ক্লার্কের কাজ করতেন। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে ডাকাত তাঁকে গুলিতে হত্যা করে স্টেশনের টাকা লুট করে নিয়ে যায়। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে এক বন্ধুর মাধ্যমে তারা রিয়েলের মৃত্যুর খবর পান। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে শাশুড়ি নির্বাক হয়ে পড়েছেন। তিনি রবিবার সারা দিন ছিলেন নির্বাক।

বন্ধু আবু সাইদ জানান, জাবিতে তাঁরা একসঙ্গে পড়েছেন। রিয়েল এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, ২০০৮ সালে ঢাকার সেন্ট যোশেফ কলেজ থেকে এইচএসসি ও গাজীপুরের সরকারি রানী বিলাসমণি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। সদা হাসিখুশি রিয়েল ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়। সুযোগ পেলেই পাহাড়, জঙ্গল নদ-নদী-হাওর দেখতে বেরিয়ে পড়তেন। ছিলেন বন্ধুবৎসল। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করতে গিয়েও কাউকে ভুলে যাননি। প্রায় প্রতিদিন ফোন করতেন। দেশের খবর জানতে চাইতেন। দেশকে খুব ভালোবাসতেন। দেশে ফিরে মহাকাশ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

নিউ অর্লিয়েন্সের রিজিওনাল ট্রানজিট কমিশনারের দায়িত্বে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি মোস্তফা সারওয়ার জানান, ময়নাতদন্ত শেষে আজ সোমবার ফিরোজের লাশ হস্তান্তর করা হতে পারে। এরপর দেশে পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

ফিরোজের মৃত্যুতে তাঁর পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক গোল্ডেন জি রিচার্ড শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। ২০২৩ সালে তাঁর কোর্স শেষ হওয়ার কথা ছিল।’

ফিরোজ জাবির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩৮তম ব্যাচের এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণা করতে দেখা গেছে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে ফিরোজ ছিলেন বড়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা