kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হলো ভারতের চন্দ্রযান-২

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হলো ভারতের চন্দ্রযান-২

ছবি: ইন্টারনেট

ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান চন্দ্রযান-২ একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। চাঁদের মাটি স্পর্শ করার ঠিক আগ মুহূর্তে মহাকাশযানটির ল্যান্ডার ‘বিক্রম’-এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে মাত্র ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল ল্যান্ডার বিক্রম। ইসরোর বিজ্ঞানীরা একে কয়েক সেকেন্ডের দূরত্ব বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা আগেই জানিয়েছিলেন, অবতরণের শেষ ১৫ মিনিট হবে আতঙ্কের, যা নিয়ে তাঁরা উৎকণ্ঠায় ছিলেন।

এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এক সাফল্য থেকে বঞ্চিত হলো ভারত। অভিযান সফল হলে ভারত হতে পারত চাঁদের মাটিতে অবতরণকারী বিশ্বের চতুর্থ দেশ। এর আগে চাঁদে যত অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সেগুলোর অর্ধেকই ব্যর্থ হয়েছে। তবে ইসরোর এক বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, চন্দ্রাভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। তিনি বলেন, চন্দ্রযান-২-এর মাত্র ৫ শতাংশ খোয়া গেছে। তাই প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মিশন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। তিনি বলেন, ল্যান্ডার বিচ্ছিন্ন হলেও অরবিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাই গোটা বছর চাঁদের ছবি পাঠাতে পারবে এই অরবিটার।

অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য দেখতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। ভারতের কোটি কোটি মানুষও রাত জেগে চোখ রেখেছিল টিভি পর্দায়, চন্দ্রাভিযানের সাফল্য দেখতে।

গত ২২ জুলাই রকেটে করে যাত্রা শুরু করে চন্দ্রযান-২। উৎক্ষপণের পর দীর্ঘ ৪৮ দিনের যাত্রা শেষে সব কিছু ঠিকমতোই এগিয়ে যাচ্ছিল। ইসরোর বিজ্ঞানীরা আগের দিন জানিয়েছিলেন, চন্দ্রযান-২ অবতরণ করবে রাত ১টা ৫৫ মিনিটে।

শুক্রবার রাত তখন ১টা ২২ মিনিট। মিডিয়া সেন্টারের পর্দায় তখন দেখা যাচ্ছে, কম্পিউটারে শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করছেন মহাকাশ প্রকৌশলীরা। মিডিয়া সেন্টারের সাংবাদিকদের মধ্যেও তখন চাঞ্চল্য তৈরি হয়। ১টা ২৩ মিনিটে পর্দায় ভেসে উঠল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোদির আগমন।

রাত তখন ১টা ৩৮ মিনিট। শুরু হলো গায়ে কাঁটা দেওয়া শেষ কয়েকটি মিনিট, যাকে বিজ্ঞানীরা বলে আসছিলেন ‘১৫ মিনিটের আতঙ্ক’। অবতরণকারী (ল্যান্ডার) বিক্রম গতি কমাতে শুরু করে। ল্যান্ডারটি তখন চাঁদের ৩০ কিলোমিটার ওপরে। তখনো বিক্রমের ঠিক মাথার ওপরে থেকে ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়ে যাচ্ছে অরবিটার। সেই ছবি পর্দায় ভেসে উঠতেই কন্ট্রোল রুমে হাততালি বিজ্ঞানীদের। কেটে গেল আরো ১০ মিনিট। ফের আরো দ্রুত গতি কমানোর কাজ করতে থাকে বিক্রম। ১টা ৫০ মিনিটের দিকে সে তার অবতরণস্থল (ল্যান্ডিং সাইট) বাছাই করতে শুরু করে। কেটে যায় আরো দুই মিনিট। বাকি আর কয়েক সেকেন্ড। বিক্রম তখন চাঁদের মাটি থেকে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার ওপরে। তখনই থমকে গেল পর্দা।

ইসরো সদর দপ্তরে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা। এক অদ্ভুত নীরবতা। রাত তখন ১টা ৫৩ মিনিট। প্রধানমন্ত্রীর গালে হাত। ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন শিবন ও কিরণ কুমার। কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। কয়েক মিনিটের অস্বস্তিকর সময় পার করে ২টা ৬ মিনিট নাগাদ সাময়িক একটু বিভ্রান্তিও দেখা দেয় যে ল্যান্ডারের সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সব সংশয় দূর করে এর পরই ঘোষণা দেওয়া হয় চন্দ্রযান-২-এর মিশন সফল হয়নি।

চন্দ্রযান-২-এর তিনটি অংশ ছিল। অরবিটার, ল্যান্ডার ও রোভার। ল্যান্ডার বিক্রমের সফল অবতরণ (সফট ল্যান্ডিং) ঘটলে এর ভেতর থেকেই বের হওয়ার কথা ছিল রোভার (চাঁদের গাড়ি) প্রজ্ঞান। সব কিছু ঠিকমতো হলে গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে ল্যান্ডার বিক্রম থেকে রোভার ‘প্রজ্ঞান’ আলাদা হতো।

ইসরোর বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২২ জুলাই মিশন শুরুর পর সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল। তাঁদের সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মহাকাশযান চন্দ্রযান-২ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেছিল গত ২০ আগস্ট।

কক্ষপথে ঘুরতে থাকা চন্দ্রযান-২-এর অরবিটার থেকে আলাদা হয়ে গতকাল প্রথম প্রহরে চাঁদের ৭০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে নিয়ন্ত্রিত অবতরণের কথা ছিল ল্যান্ডার বিক্রমের। তারপর উপযোগী পরিবেশে ল্যান্ডার বিক্রম থেকে বেরিয়ে আসত রোবটযান প্রজ্ঞান।

চাঁদে নিয়ন্ত্রিত অবতরণের মিশন সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পর তালিকায় চতুর্থ দেশ হিসেবে নাম লেখাতে পারত ভারত। প্রজ্ঞান ঠিকমতো কাজ করলে ভারত হতো চন্দ্রপৃষ্ঠে রোভার চালাতে সফল হওয়া তৃতীয় দেশ। আর ভারত হতো চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণে সক্ষম হওয়া প্রথম দেশ।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, এ পর্যন্ত চাঁদে ৩৮টি সফল অবতরণের (সফট ল্যান্ডিং) চেষ্টা চালিয়েছে বিভিন্ন দেশ। এর মধ্যে অর্ধেক প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। সর্বশেষ কয়েক মাস আগে ইসরায়েলের একটি চন্দ্রাভিযান চাঁদের মাটি স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়।

গত শুক্রবার রাতের চূড়ান্ত অভিযান ব্যর্থ ঘোষণার পর ইসরোর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় বিজ্ঞানীদের নতুন অভিযানের উৎসাহ দিয়ে মোদি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে পড়িনি। চাঁদে পৌঁছনোর জন্য আমাদের ইচ্ছাশক্তি আরো প্রবল হলো, সংকল্প আরো দৃঢ় হলো। আপনাদের পাশে আছে পুরো ভারত।’ সূত্র : এএফপি, আনন্দবাজার, ওয়াশিংটন পোস্ট।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা