kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বগুড়ায় উদ্ভাবন

শিশু বিছানা ভেজালেই স্যালাইন শেষ হতেই বাজবে অ্যালার্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু বিছানা ভেজালেই স্যালাইন শেষ হতেই বাজবে অ্যালার্ম

মো. মাহমুদুন্নবী বিপ্লব তাঁর উদ্ভাবিত অটোমেটিক বেবি ইউরিন অ্যালার্ম বেডের কাজে ব্যস্ত। ছবি : কালের কণ্ঠ

শূন্য থেকে ছয় মাস বয়সী কোনো শিশু বিছানায় প্রস্রাব করলে সঙ্গে সঙ্গে তা জানিয়ে দেবে বিছানাই। সম্প্রতি এমন একটি বিছানা উদ্ভাবন করেছেন বগুড়ার মাহমুদুন নবী বিপ্লব। একই সঙ্গে তিনি উদ্ভাবন করেছেন স্যালাইন অ্যালার্ম সিস্টেম। রোগীর স্যালাইন শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে সিস্টেমটি সেন্সরের (সতর্কবার্তা) মাধ্যমে তা জানিয়ে দেবে কর্তব্যরত নার্স ও রোগীর স্বজনদের।

বিপ্লব পেশায় একজন যন্ত্র প্রকৌশলী। বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক এই শিক্ষার্থী এর আগে ইনটেলিজেন্ট ডিসি ভেন্টিলেশন সিস্টেম এবং বন্যা সতর্কীকরণ যন্ত্র উদ্ভাবন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

বিছানাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বেবি ইউরিন অ্যালার্ম বেড’। আড়াই বছর আগে নিজের সন্তান জন্মের পরপরই এমন একটি বিছানা তৈরি করার ভাবনা আসে বিপ্লবের মধ্যে। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান বিছানায় প্রস্রাব করে তিন-চার ঘণ্টা ওই প্রস্রাবের মধ্যেই থাকত। ভেজা বিছানায় থেকে ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয় শিশুটি। তখনই ভাবি, ছোট শিশুরা তো কথা বলতে জানে না। প্রস্রাব করে অনেক সময় কান্নাও করে না। তাই তাদের জন্য এমন একটি বিছানা যদি করা যায় যে বিছানায় শিশু প্রস্রাব করার সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। তখন তাত্ক্ষণিক মা বা পরিবারের কেউ এসে শিশুর বিছানাটি বদলে দিতে পারবে।’ এরপর প্রায় দুই বছর গবেষণা করে ‘বেবি ইউরিন অ্যালার্ম বেড’টি তৈরি করেন তিনি।

বিছানাটি তৈরি করতে বিপ্লব ব্যবহার করেছেন এক ধরনের সেলুলয়েডের (সংকেত পরিবাহী) সুতা ও পানিরোধী (ওয়াটারপ্রুফ) কাপড়। দুটি উপাদানই তিনি চীন থেকে এনেছেন। সাধারণ রাবার ক্লথের মতো দেখতে হলেও বিছানাটিতে সংকেত পরিবাহী সুতায় তৈরি নকশা করা সার্কিট রয়েছে। এটি শরীরের কোনো ক্ষতি করবে না, আবার প্রস্রাব বা পানি চিনতে পারবে। এই বিছানায় রয়েছে একটি কন্ট্রোল সার্কিট ও একটি ওয়্যারলেস কলিং বেল। বিছানায় বাচ্চা প্রস্রাব

করলে সিস্টেমটি একটি সংকেত পাঠাবে কলিং বেলে। সঙ্গে সঙ্গে কলিং বেলটি সংকেতের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে যে বাচ্চা প্রস্রাব করেছে। একটি বিছানা তৈরি করতে খরচ পড়েছে এক হাজার ৩৫০ টাকা। বিপ্লব বিক্রি করছেন এক হাজার ৫০০ টাকায়। এরই মধ্যে বিছানাটি বগুড়া শহরের বড় বড় দোকান বা বিপণিবিতানে পাওয়া যাচ্ছে।

মাহমুদুন নবী বিপ্লবের উদ্ভাবিত আরেকটি যন্ত্র হলো স্যালাইন অ্যালার্ম। এটি একটি ডিজিটাল সিস্টেম, যা রোগীকে স্যালাইন দেওয়ার পর যখন স্যালাইন শেষ হবে তার আগমুহূর্তে সেন্সরের মাধ্যমে কর্তব্যরত নার্সকে জানাবে যে রোগীর স্যালাইন শেষ হয়েছে।

যন্ত্রটির কার্যকারিতা সম্পর্কে বিপ্লব ধারণা দেন এভাবে, ‘মনে করুন একটি হাসপাতালে ১০টি কেবিন ও একটি ওয়ার্ড আছে। ওয়ার্ডে ১০টি বেড বা বিছানা আছে। সর্বমোট বেড হলো ২০টি। কিন্তু সেখানে নার্স আছেন চারজন। ২০টি বেডের জন্য চারজন নার্সের পক্ষে অনেক সময় সব রোগীর খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই দেখা যায়, রোগীর স্যালাইন শেষ হওয়ার পর রক্ত স্যালাইনের (নল দিয়ে প্যাকেটে) মধ্যে উঠে যায়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমার আবিষ্কার স্যালাইন অ্যালার্ম। দেখা গেছে, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের একটি ডিউটিরুম থাকে, যেখানে নার্সরা অবস্থান করেন। এই ডিভাইসটি (অ্যালার্ম) দুটি অংশে বিভক্ত—সেন্সর ও কলিং বেল। তাই ২০টি বেডের জন্য ২০টি সেন্সর থাকবে প্রতিটি স্যালাইনের সঙ্গে। সেই সঙ্গে ২০টি কলিং বেল থাকবে নার্স ডিউটিরুমে। বেডের সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী যে বেডের রোগীর স্যালাইন শেষ হবে সঙ্গে সঙ্গে সেই বেডের বেলটি ডিউটিরুমে বেজে উঠবে। তখন ডিউটিরত নার্স গিয়ে স্যালাইনটি রোগীর শরীর থেকে খুলে দেবে। ফলে রোগী বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।’

যন্ত্র প্রকৌশলী বিপ্লব বলেন, স্যালাইন অ্যালার্ম হলো একটি ডিজিটাল সিস্টেম। স্যালাইন শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে সিস্টেমটি সেন্সরের মাধ্যমে ডিউটিরত নার্স ও রোগীর স্বজনদের জানাবে। এটি করতে প্রতিটি স্যালাইনের সঙ্গে একটি করে সেন্সর লাগাতে হবে। সব মিলিয়ে এই ডিভাইসের প্রতিটির দাম ছয় হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে হবে। সংখ্যায় বেশি তৈরি করলে খরচ আরো কমে যাবে।

এটুআই বগুড়ার বোর্ড সদস্য বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘বিপ্লবের উদ্ভাবন আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। এটি সুন্দরভাবে কাজ করে। আমরা এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতার জন্য সুপারিশ করেছি।’

এর আগে বিপ্লবের দুটি উদ্ভাবন সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) বিভাগে প্রদর্শন করা হয়। সেগুলো হলো ইনটেলিজেন্ট ডিসি ভেন্টিলেশন সিস্টেম ও বন্যা সতর্কীকরণ যন্ত্র। এ ব্যাপারে তাঁকে সরকারি সহযোগিতা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠাতে থাকবে বন্যা সতর্কীকরণ যন্ত্র। এমনকি বন্যার পানি বাড়ার অনেক আগে থেকেই অবিরাম সাইরেনের আওয়াজে সতর্ক করবে নদ-নদীতীরবর্তী জনপদের লোকজনকে। সুযোগ মিলবে জানমাল নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটি তৈরিতে খরচ পড়বে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা।

আর ইনটেলিজেন্ট ডিসি ভেন্টিলেশন সিস্টেম হলো বিদ্যুৎসাশ্রয়ী একটি যন্ত্র। এই যন্ত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তৈরিতে খরচও তুলনামূলক বেশ কম, ৩৫-৩৬ হাজার টাকা। দুই টনের একটি এসি (দুই হাজার ৪০০ ওয়াট) প্রতি ঘণ্টায় ১৬ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। সেখানে এই ডিসি ভেন্টিলেশন সিস্টেমে (৯৫ ওয়াট) প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ খরচ হবে মাত্র ১ দশমিক ৫২ ওয়াট। এতে করে বাতাসে কার্বন নির্গমন অনেক কমে গিয়ে পরিবেশদূষণ রোধ হবে, দাবি করেন বিপ্লব।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা