kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চট্টগ্রামের সড়ক-ফ্লাইওভার

ব্যাপক উন্নয়নের পরও মিলছে না সুফল

দুর্ভোগ-ভোগান্তির শেষ কবে জানে না কেউ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাপক উন্নয়নের পরও মিলছে না সুফল

চট্টগ্রামে সড়ক উন্নয়নের যথাযথ সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। নির্মাণ ও সম্প্রসারিত সড়কগুলোর কোনোটি এক লাইন বন্ধ আবার কোনোটিতে দুই পাশে যানবাহন রাখা হয়েছে। দখল হয়ে গেছে ফুটপাতও। ছবিটি নগরীর বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নগরের সবচেয়ে লম্বা ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কালুরঘাট থেকে শাহআমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়ক। সাড়ে চার বছর আগে প্রধান এ সড়কের মধ্যে বহদ্দারহাট থেকে কালুরঘাট সেতু এলাকা পর্যন্ত (আরাকান সড়ক) ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়ক প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকাজ করেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। কিন্তু চার লেনের এ সড়কের উন্নয়নকাজের পর গত প্রায় তিন বছর ধরে একই সড়কের কাপ্তাই রাস্তার মোড় থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই লেন বন্ধ রয়েছে। ওয়াসার উন্নয়ন প্রকল্প (পাইপলাইন স্থাপন) কাজের কারণে একমুখী (দুই লেন) যানবাহন চলাচলে জনগণের দুর্ভোগ-ভোগান্তির যেন শেষ নেই।

প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২৮ মিটার প্রশস্ত বায়েজিদ বোস্তামী সড়কের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন (প্রবর্ত্তক মোড় থেকে অক্সিজেন জংশন পর্যন্ত) কাজ শেষ হয়েছিল প্রায় আট বছর আগে। কিন্তু চার লেনের এ সড়কের মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন যানবাহন রাখা হয়। এ কারণে সড়কে এখন প্রায় সময় যানজট লেগে থাকছে।

২৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮ দশমিক ৩ মিটার প্রশস্ত সিরাজউদ্দৌলা সড়কে সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন (আন্দরকিল্লা জংশন থেকে চকবাজার পর্যন্ত) কাজ করা হয়। এক লেনের এই সড়ক আট বছর আগে চার লেন করা হলেও যত্রতত্র বিভিন্ন যানবাহন দাঁড়ানো, সড়কের নানা অংশে বাজার বসাসহ বিভিন্ন কারণে উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে না জনগণ।

সদরঘাট ও ফিরিঙ্গী বাজার সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে সাড়ে ২৪ কোটি টাকা খরচ করা হয়। তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮ দশমিক ৩ মিটার প্রশস্ত এই সড়কে এখন কাঁচা তরিতরকারির বাজার-দোকান ও ওয়াসার উন্নয়নকাজের কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে আর বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। এই দুর্ভোগ-ভোগান্তির শেষ কবে তা জানে না কেউ।

আগে নগরের অভ্যন্তরীণ প্রায় সড়ক ছিল এক লেনের। বর্তমান সরকারের গত দুই মেয়াদে ৭০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১৫টি সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে। এতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। গত আট থেকে ১০ বছরে নগর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার-মেরামতকাজে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এ ছাড়া সিডিএ বর্তমান সরকারের গত দুই মেয়াদে নগরে তিনটি ফ্লাইওভার ও একটি ওভারপাস নির্মাণ করেছে। এতেও হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু ফ্লাইওভার ও ওভারপাসের নিচে যত্রতত্র যানবাহন রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

গত কয়েক দিন নগরের বেশ কিছু সড়ক ঘুরে সেখানে নানা অব্যবস্থাপনা ও মানুষের দুর্ভোগ ভোগান্তি দেখা যায়। ১০ বছরে অধিকাংশ সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকাজ করা হলেও এর পুরোপুরি সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। প্রায় সড়কে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার নেই। সেই সঙ্গে ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার উন্নয়নকাজের কারণে বিভিন্ন সড়কে একমুখী যানবাহন চলাচল করছে, সড়ক ও ফুটপাতে যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পকাজের নির্মাণসামগ্রীও সড়কেই রাখা হয়।

মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা পরিচয়ে সাঈদ নামের একজন বললেন, ‘সিডিএ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভার (আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার) নির্মাণ করলেও ফ্লাইওভারের নিচে ডিভাইডার পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। ফলে যত্রতত্র যানজট হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রাম নগরে সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, নতুন নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও এর পুরোপুরি সুফল থেকে নগরবাসী বঞ্চিত হচ্ছে। নগরে গণপরিবহন রাখার জন্য একটি টার্মিনালও নেই। তাই বাধ্য হয়ে গাড়ি যখন চলাচল করে না তখন রাস্তা ও রাস্তার পাশে রাখতে হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে উন্নয়নের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাপ্তাই রাস্তার মোড় থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত আরাকান সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কে চট্টগ্রাম ওয়াসার উন্নয়ন প্রকল্প কাজের কারণে একমুখী যানবাহন চলাচল করছে। এ কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে শুধু ওই সড়কে নয়, চট্টগ্রাম ওয়াসা যেখানে তাদের প্রকল্পকাজ শেষ করছে আমরা সেখানে সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারকাজ শুরু করছি।’

সিটি মেয়র বলেন, ‘সড়কে যত্রতত্র গাড়ি রাখা হচ্ছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরে গণপরিবহন রাখার কোনো স্থায়ী টার্মিনাল নেই। ইতিমধ্যে কুলগাঁও এলাকায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের পর আমরা সেখানে বাস টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু করব।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘২০১৪ সালে আমরা আরাকান সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকাজ শেষ করেছি। শুধু এ সড়ক নয়, ইতিমধ্যে ১৫টি সড়ক চার লেন করেছি। কিন্তু এখন দেখবেন বেশির ভাগ সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। সড়কগুলোর সুফল মানুষ পাচ্ছে না।’

সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘নগর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে প্রতিবছর অন্তত শতকোটি টাকা ব্যয় হয় আমদের। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কে উন্নয়নকাজ করা হয়। কিন্তু অনেক সড়কে ওয়াসার উন্নয়ন প্রকল্পের কাটাকাটিতে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা