kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে ভাটা

জিয়াদুল ইসলাম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে ভাটা

ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিয়েছে মানুষ। এতে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জুন শেষে আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯.৯৪ শতাংশে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কয়েক বছর ধরে টানা কমছে আমানতের প্রবৃদ্ধি।

বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট আস্থার সংকট এবং সঞ্চয়পত্রের চেয়ে আমানতের সুদ তুলনামূলক কম হওয়ায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া গত বছরের আগস্ট থেকে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা-ও সাধারণ মানুষকে ব্যাংকবিমুখ করেছে। তাদের অনেকেই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকেছে। এদিকে আমানতের পাশাপাশি ঋণপ্রবৃদ্ধিও কমছে। তবে এখনো আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণপ্রবৃদ্ধি বেশি রয়েছে বেশ কিছু ব্যাংকের। এতে ব্যাংকিং খাতে চলমান তারল্য সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই আস্থার সংকটের কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প উৎসর সুদহার বেশি হওয়ায় সেখানেও মানুষ ঝুঁকতে পারে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আমানতের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি রয়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমার ক্ষেত্রে এটিই মূল কারণ। কেননা মানুষ যে উৎস সুদ বেশি পাবে সেখানেই টাকা খাটাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও (ঋণ ও আমানতের অনুপাত) সমন্বয় করতে হবে। গত জুন মাস শেষে প্রায় ১৫টি ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার বাইরে ছিল। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণ বেশি মাত্রায় রয়েছে। তাই ওই সব ব্যাংকে এডিআর সমন্বয় করতে হলে আমানত বাড়াতেই হবে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি এ তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকও রয়েছে।

বিভিন্ন ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি গ্লোবাল, পদ্মা, মধুমতি, ইউনিয়ন, এনআরবি কমার্শিয়াল, সাউথ বাংলা, মিডল্যান্ড এবং পুরনো ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল, এবি ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক আকর্ষণীয় সুদে আমানত সংগ্রহ করার ঘোষণা দিয়েছে। এদের কেউ কেউ দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত প্রকল্পে সাড়ে ১২ শতাংশের বেশি সুদ ঘোষণা করেছে। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে যে সুদ দেওয়া হচ্ছে তাতে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরেই প্রাথমিক জমা দ্বিগুণ হবে। এ ছাড়া ব্যাংকটি এক বছর থেকে তিন বছর মেয়াদি আমানত প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখে মাসে এক হাজার টাকা সুদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পদ্মা ব্যাংকেও দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত প্রকল্পে প্রাথমিক জমা সাড়ে পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হবে।  অর্থাৎ সাড়ে ১২ শতাংশের বেশি সুদ দেবে ব্যাংকগুলো। মধুমতি ব্যাংকে প্রাথমিক জমা পাঁচ বছর ১০ মাসেই দ্বিগুণ হবে। আর ইউনিয়ন ব্যাংকে দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত প্রকল্পে প্রাথমিক জমা ছয় বছরে দ্বিগুণ হবে। সুদের হার ধরা হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। এ ছাড়া তিন বছর মেয়াদি মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পে ব্যাংকটি ১২ শতাংশ সুদ ঘোষণা করে আমানত নিচ্ছে। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ছয় বছর ছয় মাসে এবং মিডল্যান্ড ব্যাংকে ছয় বছর ১০ মাসে দ্বিগুণ হবে প্রাথমিক জমা রাখা টাকা। পুরনো ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত প্রকল্পে ছয় বছরেই দ্বিগুণ হবে। আর এবি ব্যাংকে ছয় বছর পাঁচ মাসে, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ছয় বছর ছয় মাসে এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ছয় বছর ১১ মাসে দ্বিগুণ হবে প্রাথমিক জমা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে ২০১২ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২০ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা নেমে আসে ১৫.৯৯ শতাংশে। ২০১৪ সালে প্রবৃদ্ধি আরো কমে ১৩.৪৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে ১৩.০৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১২.৭৮ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১০.২২ শতাংশ এবং গত বছর তা সর্বনিম্ন ৯.০৫ শতাংশে নেমে আসে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাস আমানতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও পরের তিন মাস (এপ্রিল থেকে জুন) আবার কমেছে। গত মার্চে বার্ষিক আমানতের প্রবদ্ধি ১০.৫৮ শতাংশে উন্নীত হলেও জুন শেষে তা আবার নেমে এসেছে ৯.৯৪ শতাংশে।

ধারাবাহিক আমানতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়ে যাওয়া এবং ডলার কেনার পেছনে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ব্যয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকিং খাতে চলছে তারল্য সংকট। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিও সেভাবে বাড়ছে না। গত অর্থবছরের শেষার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৫ শতাংশ থাকলেও জুনে অর্জিত হয়েছে মাত্র ১১.৩০ শতাংশ; যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা