kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হুমকিতে সমতলের চা শিল্প

লুৎফর রহমান, পঞ্চগড়   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হুমকিতে সমতলের চা শিল্প

সড়কে চা পাতা ঢেলে, বিক্ষোভ সমাবেশ করে চা চাষিরা তাদের ন্যায্য দাবির কথা জানিয়ে আসছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

হুমকির মুখে পড়েছে দেশের তৃতীয় বৃহৎ চা অঞ্চল পঞ্চগড়ের সমতল অঞ্চলের চা শিল্প। কয়েক মাসের ব্যবধানে চা পাতার দর প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। গত সাত মাসে প্রতি কেজি চায়ের দাম কমেছে ২০ থেকে ২৬ টাকা পর্যন্ত। বছরের শুরুতে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। এর মধ্যে কারখানাগুলো ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর্তন করে দাম দেয় বলে অভিযোগ চাষিদের।

কিন্তু এর পরও কারখানা মালিকরা মূল্য নির্ধারণ কমিটির বেঁধে দেওয়া দর মানছে না। এ পর্যন্ত চারবার ওই কমিটি মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও এর কোনোটিই মানেনি কোনো কারখানা। এভাবে কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের কবলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পঞ্চগড়ের ছয় সহস্রাধিক চা চাষি। স্থানীয় যুবকদের একটি বড় অংশ চা বাগনে টাকা বিনিয়োগ করে এখন বিপাকে পড়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারখানা মালিকদের দেওয়া ১০-১২ টাকায় প্রতি কেজি চা পাতা বিক্রি করে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। চাষিরা জানায়, চা পাতার ন্যায্য মূল্যের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিলেও সুফল মেলেনি। এভাবে চলতে থাকলে পঞ্চগড়ের চা শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন চলছে চায়ের ভরা মৌসুম। এই সময়েই এ জেলার সম্ভাবনাময় চা শিল্প পড়েছে গভীর সংকটে। ক্ষুদ্র চাষিরা বলছে, প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে চা কারখানা মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় চরম বিপাকে পড়েছে ক্ষুদ্র চা চাষিরা। অকশন মার্কেটেও পঞ্চগড়ের চা সর্বনিম্ন ৭৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ দেশের অন্য এলাকার চা এর দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।

চাষিরা জানায়, বছরের শুরুতে প্রতি কেজি চা পাতা ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও তা এখন নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। জেলার চা পাতা মূল্য নির্ধারণ কমিটির সিদ্ধান্তও মানছে না কারখানা মালিকরা।

চাষিদের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতি কেজি চা উৎপাদন করতে খরচ ১২ থেকে ১৫ টাকা। আর সেই চা কারখানায় নিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। এর মধ্যে আরো কর্তন করে দাম দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতি কেজি চা বিক্রি করে তাদের লোকসান হচ্ছে চার থেকে পাঁচ টাকা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল গোয়ালপাড়া এলাকার চা চাষি আমিনার রহমান বলেন, ‘আমাদের দেখাদেখি অনেক মানুষ নতুন করে চা বাগান করেছে। কিন্তু চা পাতার বর্তমান বাজার ১০-১২ টাকায় নেমে আসায় তারা এখন বাগান নষ্ট করে অন্য কিছু করতে চাচ্ছে।’

তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান এলাকার চা চাষি খন্দকার আমিনুর রহমান বাবু বলেন, ‘দার্জিলিংয়ের চায়ের মতো আমাদের চা। অথচ অকশন মার্কেটে দাম অর্ধেক। বিষয়টি রহস্যজনক। বড় সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়েছে আমাদের চা শিল্প।’

অন্য চা চাষি রবিউল আলম বলেন, ‘সরকারিভাবে পঞ্চগড়ে একটি চা কারখানা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমরা পঞ্চগড়ে একটি সরকারি চা কারখানা ও সমতলের চায়ের জন্য আলাদা অকশন মার্কেট করার দাবি জানাচ্ছি।’

এদিকে তেঁতুলিয়ার গ্রিন কেয়ার অ্যাগ্রো লিমিটেড চা কারখানার ম্যানেজার মঞ্জুর আলম বলেন, ‘যেসব চাষি সাড়ে চার পাতা করে দিচ্ছে তারা নির্ধারিত দরেই দাম পাচ্ছে। আর যারা তার চেয়ে বেশি দিচ্ছে তাদের ওই দাম দেওয়ার সুযোগ নেই। মূলত অকশনে পঞ্চগড়ের চায়ের দাম কমে গেছে। আমরা ভালো দাম না পেলে চাষিদের ভালো দাম দেব কিভাবে? আমরা বাঁচলে চাষিরা বাঁচবে, চাষিরা বাঁচলে আমরা বাঁচব।’

তেঁতুলিয়া টি কম্পানি লিমিটেড চা কারখানার মালিক ও নর্থ বেঙ্গল টি ফ্যাক্টরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এ বছর এখন পর্যন্ত আমাদের উৎপাদিত চায়ের ৪০ শতাংশও অকশনে বিক্রি করতে পারিনি। অকশনে আমাদের চায়ের দাম খুব নিচে নেমে গেছে। অকশন মার্কেটে চা পাতার দাম না বাড়লে আমরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হব তেমনি কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

পঞ্চগড় চা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দার্ন বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক ড. শামীম আল মামুন বলেন, ‘অকশন মার্কেটের গড় দামের ওপর ভিত্তি করে চা পাতার দর নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ প্রতি কেজি চা পাতার দাম নির্ধারণ করা হয় ১৬ টাকা ৮০ পয়সা। আমরা ঘুরে দেখেছি, যারা সাড়ে চার পাতা করে দিচ্ছে তারা ঠিক দামই পাচ্ছে। যারা তার চেয়ে বেশি পাতা দিচ্ছে তারা কম দাম পাচ্ছে। তবে আগের চেয়ে এখন অকশনে পঞ্চগড়ের চায়ের দাম একটু একটু করে বাড়ছে। ভালো মানের চা তৈরি করা গেলে অকশন মার্কেটে অবশ্যই ভালো দাম মিলবে। সে জন্য পঞ্চগড় চা চাষিদের সাত দিন পর পর চা উত্তোলনের অভ্যাস করতে হবে। তারা ৩০ থেকে ৪০ দিন পর পর চা উত্তোলন করে থাকে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ক্ষুদ্র চা চাষিরা দাম কম পাচ্ছে বলে আমি জেনেছি। চা পাতার দাম কমার পেছনে কারখানা মালিক ও চাষিরা উভয়ে উভয়কে দায়ী করছে। তার পরও কোনো চাষি যদি সাড়ে চার পাতা করে চা দিয়ে মূল্য নির্ধারণ কমিটির নির্ধারিত দর না পায় তাহলে সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, পঞ্চগড় জেলায় ২৫টি চা কারখানার অনুমোদন দিয়েছে চা বোর্ড। এর মধ্যে ১৫টি কারখানায় তৈরি চা উৎপাদন করা হচ্ছে। ছোট, মাঝারি ও এস্টেট পর্যায়ে ছয় হাজারেরও বেশি চা বাগান গড়ে উঠেছে। এই চা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে এ এলাকার ৩০ হাজারেও বেশি মানুষ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা