kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভক্ত জয়পুরহাট আ. লীগ

জয়পুরহাট প্রতিনিধি   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভক্ত জয়পুরহাট আ. লীগ

স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জয়পুরহাটে আওয়ামী লীগের জেলা থেকে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের কোন্দল এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। এই কোন্দলে ঘি ঢেলেছে উপজেলা নির্বাচন। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জের ধরে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন সমর্থকদের দুই পক্ষের সংঘাতে কালাই উপজেলায় এ পর্যন্ত খুন হয়েছে তিন কর্মী।

দ্বন্দ্বের কারণে গত বছরের ২১ জানুয়ারি জেলার উভয় পক্ষের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ঢাকায় ডেকে নিয়ে জেলা কমিটির মাধ্যমে সংগঠন পরিচালনার নির্দেশ দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু এর পরও দুই শিবিরে বিভক্ত জেলা আওয়ামী লীগ। দলের এই বিভাজন নিরসনে কার্যত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করে, জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান অভিভাবক জেলার দুই সংসদ সদস্য। তাঁরা উদ্যোগ নিলেই দলে কোন্দলের অবসান ঘটবে। বিশেষ করে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন উদ্যোগ নিলেই পাল্টে যাবে চিত্র।

জানতে চাইলে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় দলে নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য থাকে। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দলের নেতৃত্বে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। এ নিয়ে তিনজন কর্মী মারা গেছেন। রাতারাতি এর সমাধান চাইলে পাওয়া যাবে না।’

নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ, দ্বিধা আছে স্বীকার করে স্বপন বলেন, ‘আমরা এ দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করছি। কিন্তু দলের মধ্যে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আছে, যাদের কর্মকাণ্ড দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব এলে এ অবস্থার অবসান ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের গত সম্মেলন হয় ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে। সম্মেলনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি পদে বর্তমান সংসদ সদস্য সামছুল আলম দুদু ও সাধারণ সম্পাদক পদে এস এম সোলায়মান আলী দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। দলে তখন কোনো কোন্দলও ছিল না। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রে লিখিত নালিশ করার অভিযোগে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের সঙ্গে জেলার সভাপতি ও সম্পাদকের

কোন্দলের সূত্রপাত ঘটে। সে সময় রামদেও বাজলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্বপন সভাপতি ও সম্পাদকের লিখিত নালিশ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। আর সেই থেকে দলটির জেলা কমিটির নেতৃত্বে দৃশ্যমান বিভক্তি ঘটে; যার এক পক্ষের নেতৃত্বে আছেন স্বপন এবং অন্য পক্ষে নেতৃত্বে আছেন সামছুল আলম দুদু ও সোলায়মান আলী। বিভক্ত জেলা কমিটির বড় অংশ স্বপনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ওই দুজনের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপনসহ জেলা কমিটি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তারা ব্যর্থ হয়। সেই থেকে দলটির সব কার্যক্রম চলছে দুই পক্ষের নেতৃত্বে। তবে নেতৃত্বে বিভাজন থাকলেও টেন্ডার, নিয়োগ ব্যণিজ্য, বালুমহাল ও পুকুর ইজারাসহ লাভজনক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে উভয় পক্ষের কতিপয় নেতার মধ্যে সখ্য রয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দল মনোনীত প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুরে প্রার্থী নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে।

কালাই উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে সংঘর্ষে উপজেলা চেয়ারম্যান পক্ষের দুই সমর্থক নিহত হয়। বিরোধের জের ধরে গত শুক্রবার রাতেও দুই পক্ষের সংঘর্ষে কালাইয়ে আওয়ামী লীগের আরো এক কর্মী নিহত হয়। খুনের আসামি হয়ে প্রায় তিন মাস জেল খাটতে হয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ ৪৭ নেতাকর্মীকে।

জানা গেছে, উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে কালাইয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যার এক পক্ষের নেতৃত্বে আছেন দলের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও কালাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও মাত্রাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হাবিব লজিক। তাঁরা দুজনেই আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের সমর্থক।

অন্যদিকে আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাচনে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম আকন্দকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ১২ ঘণ্টা পর প্রার্থী পরিবর্তন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোকছেদ আলীর নাম ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে সালাম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেন। প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য সালামের সমর্থকরা স্বপনকে দায়ী করে। ক্ষেতলালে নতুন মুখ স্বপনের পছন্দের তরুণ প্রার্থী যুবলীগ নেতা মোস্তাকিম মণ্ডল দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জয়লাভ করলেও ক্ষোভ রয়েছে পরাজিত বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তাইফুল ইসলাম ও তাঁর কর্মী সমর্থকদের মধ্যে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের মাঝারি গোছের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বপন হাল ধরার পর জয়পুরহাটে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বেশি হলেও দলে কোন্দল বেড়েছে। এর জন্য স্বপনকে দায়ী করে তাঁরা বলেন, জেলায় তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দক্ষ নেতা। তাঁর কথা উপেক্ষা করবে—দলে এমন নেতাকর্মী নেই বললেই চলে। ওয়ার্ড থেকে জেলা পর্যন্ত দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী তাঁর প্রতি আস্থাশীল। কিন্তু কোন্দল নিরসনে কার্যকর ভূমিকা না নেওয়ায় তাঁর প্রতি চরম ক্ষোভ রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের।

তবে ভিন্নমত পোষণ করেন পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাঁচবিবি পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি দলের বর্তমান অবস্থার জন্য জেলা সভাপতি সংসদ সদস্য সামছুল আলম দুদু ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলীকে দায়ী করেন।

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জয়পুরহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম সোলায়মান আলী বলেন, ‘দলে রাজনৈতিক কোনো মতভেদ না থাকলেও কোন্দল আছে।’ এর জন্য তিনি স্বপনকে দায়ী করে বলেন, ‘কোন্দলের কারণে কালাইয়ে দলের তিনজন কর্মী খুন হয়েছে। বিবদমান দুই পক্ষই স্বপনের সমর্থক। উপজেলা নির্বাচন ঘিরে খুনাখুনির ওই ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসন স্বপনকে আগেই সতর্ক করেছিল। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা