kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

উত্থান নতুন কারবারিচক্রের

শাহাদত হোসেন, শেকৃবি   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উত্থান নতুন কারবারিচক্রের

দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবারিদের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ক্যাম্পাস। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের হাত ধরেই চক্রের উত্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চক্রে জড়িত মানুষগুলো পরিবর্তন হলেও এই অপকর্ম কখনোই থেমে থাকেনি। শুধু পুরনোদের জায়গায় নতুন মাদক কারবারি এসেছে। এর অনেকে আবার মাদক সেবন ও কারবারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেকৃবি ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক মাদকচক্রে সংশ্লিষ্টদের অনেকে এখন আর ক্যাম্পাসে নেই। আবার অনেকে হয়ে পড়েছে নিষ্ক্রিয়। একই সঙ্গে নতুন চক্রের উত্থান হয়েছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদের ১৪তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর যোগসাজশে এই চক্রে সক্রিয় রয়েছে ১৬ ও ১৭তম ব্যাচের ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি ক্যাম্পাসের ভেতরে অভিযান চালাতে না পারায় এই চক্র ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক কারবারিদের চক্র দুটি ভাগে ভাগ হয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। একটি চক্র চলে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বস্তিতে স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায়। গ্রুপটি চালাচ্ছে বস্তির অবৈধ বাসিন্দাদের ১৮ থেকে ২০ জনের একটি দল। আরেকটি চক্র পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর মাধ্যমে। এরা আবার বরাবরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, শেকৃবি ছাত্রলীগের সাবেক দুই প্রভাবশালী নেতার হাত ধরেই ক্যাম্পাসে মাদক কারবারিচক্রের উত্থান। বর্তমানে তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকলেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন আরেক চক্র। নতুন এই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৪তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। তিনি আবার ক্যাম্পাসে উত্তরাঞ্চলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে ১৬ ও ১৭তম ব্যাচের ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী।

জানা গেছে, ক্যাম্পাসভিত্তিক মাদকচক্রে সক্রিয় ছাত্রনেতাদের মধ্যে উত্তরাঞ্চল ও ময়মনসিংহ অঞ্চল, কুমিল্লা অঞ্চল ও পাবনা-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক গ্রুপের সক্রিয় কয়েকজন থাকলেও ১৭তম ব্যাচের বেশির ভাগই দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রুপের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তারা আবার শেকৃবি ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। এদের মধ্যে শেকৃবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার আপন ছোট ভাইয়ের ইয়াবাসহ ছবি কালের কণ্ঠ প্রতিনিধির হাতে এসেছে। এই চক্রের মাদকের আসরের বেশ কিছু ছবিরও সন্ধান মিলেছে।

চক্রটির মূল ঘাঁটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব সিরাজউদ্দৌলা হল। ওই হলের ‘এ’ ব্লকের সপ্তম তলার একটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে মাদক ইয়াবা কারবারের ঘাঁটি হিসেবে। এই কক্ষ থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট ক্যাম্পাসে বিক্রি হচ্ছে। আর এখানে ইয়াবার চালান আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনি মার্কেটের পাশের বস্তি, পাসপোর্ট অফিসের পাশের পাকা মার্কেট, আগারগাঁও বাজার, বিএনপি বাজার ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প থেকে।

সূত্র জানায়, মিনি মার্কেটের পাশের বস্তি থেকে ইয়াবা আনা হয় নাজমুল নামের এক মাদক কারবারির কাছ থেকে। এই মাদক কারবারি একাধিকবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাদকসহ আটকও হয়েছে। এর বাইরে পাকা মার্কেট এলাকা থেকে কিরন ও ভাঙ্গা মামুন এবং জেনেভা ক্যাম্প থেকে রমজান নামের এক মাদক কারবারি ক্যাম্পাসে ইয়াবা ও গাঁজার জোগান দিয়ে আসছে।

মাদকে কারবারিদের এই চক্র বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এমন তথ্যের প্রমাণও মিলেছে। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি ছিনতাইয়ের শিকার এক উবার ড্রাইভার এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে একটা নম্বর থেকে কল করা হয়। আমি ক্যাম্পাসের পানির ট্যাংকের কাছে গেলে দুজন গাড়িতে ওঠে। পরে শেখ হাসিনা হলের পাশে নিয়ে যায়। তারপর আরেকজন এসে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়ে পড়ে যায়। পরে আহত হওয়ার ভান করে ও মোবাইল ভাঙার অভিযোগ করে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তারা গাড়ির চাবি রেখে দিতে চায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে যায়। উবারচালকের দেওয়া মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ছিনতাইয়ে জড়িত তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদের ১৬তম ব্যাচের এবং অন্য দুজন ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। প্রত্যেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং শেকৃবি ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান মিঠুর অনুসারী।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকায় শিশু-কিশোরদের মাঝে ইয়াবা ও গাঁজা সরবরাহ করে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের এক ল্যাব অ্যাটেনডেন্টের ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী সম্প্রতি উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের এক অধ্যাপকের সন্তানকেও মাদকচক্রে ভিড়িয়েছে।

মাদক সহজলভ্য হওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই আবার মাদকসেবী ও কারবারিদের ফাঁদে পা দিয়ে জড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাদকের বিষয়ে অবগত হলেও বরাবরই উদাসীন থাকছে। মাদকসহ শিক্ষার্থীদের আটকের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্টরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

এসব বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফরহাদ হোসাইনের কাছে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হলে গাঁজার গাছ পাওয়ার খবর সত্য নয়। আর মাদক দমনে আমাদের কোনো উদাসীনতা নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি। একই সঙ্গে চেষ্টা থাকে জড়িয়ে পড়াদের সুপথে ফিরিয়ে আনার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা