kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজশাহী আওয়ামী লীগে অস্থিরতা

সভাপতি-সম্পাদক দ্বন্দ্ব চরমে

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সভাপতি-সম্পাদক দ্বন্দ্ব চরমে

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। সভাপতি ও সম্পাদকের বাগ্যুদ্ধ এখন প্রকাশ্যে, তুমুল পর্যায়ে। এ নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে কোন্দল।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন তানোর-গোদাগাড়ী আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। আর সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। এই দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত জেলার আওয়ামী রাজনীতির এই অচলাবস্থা। তবে সাধারণ সম্পাদক একাই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে। এসব কর্মসূচিতে দেখা যায় না সভাপতিকে। কর্মসূচি পালনকালে সভাপতি ফারুক চৌধুরীকে রাজাকারপুত্র বলেও অভিহিত করেছেন সাধারণ সম্পাদক।

তবে ফারুক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক কর্মসূচির নামে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। ওসব কর্মসূচি কিভাবে হয়, তা রাজশাহীর মানুষ সবাই জানে। এ কারণে তাঁর সঙ্গে ওই সব কর্মসূচিতে তাঁরা যান না। তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে।’

এদিকে সম্প্রতি রাজশাহী-২ (সদর) আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর  সঙ্গেও প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে ফারুক চৌধুরীর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ফারুক চৌধুরী ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক বাদশা সম্প্রতি একটি পত্রিকার কাছে মন্তব্য করেন। এর জেরে তাঁকে আইনি নোটিশও পাঠিয়েছেন ফারুক চৌধুরী। ওই নোটিশ পাঠানোর পাশাপাশি ফারুক তাঁর নির্বাচনী এলাকায় দলের একটি অংশের নেতাকর্মীদের দিয়ে সমাবেশ করিয়ে ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

দলীয় সূত্র মতে, ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পর থেকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এতে জেলার নেতাকর্মীরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর মধ্যে বড় অংশই জেলা সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের দিকে অবস্থান নেয়। এমনকি তানোর-গোদাগাড়ীর ত্যাগী বেশ কয়েকজন নেতাও রয়েছেন আসাদের গ্রুপে। ফলে নিজ নির্বাচনী এলাকায়ও এমপি ওমর ফারুক অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন।

সম্প্রতি দলীয় একটি কর্মসূচিতে আসাদুজ্জামান আসাদ অভিযোগ করেন, ‘ফারুক চৌধুরী রাজাকারপুত্র। তিনি রাজনীতির নামে বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন।’ এমন অভিযোগের পর দুজনের দূরত্ব আরো বেড়েছে।

এদিকে গত উপজেলা নির্বাচনে ফারুক চৌধুরীর ইন্ধনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বদরুজ্জামান রবুর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে। রবু ওই সময় এ অভিযোগ করেন। ফারুক চৌধুরী তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলেও অভিযোগ করেন রবু।

সংসদ নির্বাচনের পর তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানীকেও ফারুক চৌধুরীর ইন্ধনে তানোরে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ আছে। এমনকি দলীয় সভায়ও রাব্বানীকে সভাপতিত্ব করতে দেন না। উপজেলা নির্বাচনে গোলাম রাব্বানীর ভাই চেয়ারম্যান পদে অংশ নিলে তাঁকে ফারুক চৌধুরীর ইন্ধনে পরাজিত করা হয় বলেও অভিযোগ করেন গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর রাব্বানীর সমর্থকদের বাড়ি-ঘরেও হামলা চালানো হয় এমপির নির্দেশে। সব শেষ গত বুধবার রাতে তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় মামুনের ব্যক্তিগত গাড়িটি ভাঙচুর করা হয়।

ফারুক চৌধুরী ও আসাদকে ঘিরে যখন জেলা আওয়ামী লীগে বিরাজ করছে অস্থিরতা, সেই সময় সদর আসনের এমপি ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা একটি জাতীয় দৈনিকের কাছে মন্তব্য করেন—‘ছাত্ররাজনীতির সময় বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক-রশীদের ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফারুক চৌধুরী। ফ্রিডম পার্টির মিছিলকে লাঠি নিয়ে ধাওয়া করা হয়েছিল। ধাওয়া খেয়ে পালিয়েছিলেন ফারুক চৌধুরী। তিনি (ফজলে হোসেন বাদশা) নিজেও ধাওয়া করেছিলেন ফারুক চৌধুরীকে। গত ১৮ আগস্ট বাদশার এই মন্তব্য প্রকাশের পর রাজশাহীর রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ফারুক চৌধুরী আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বাদশাকে। পাশাপাশি তাঁর এলাকায় নিজ সমর্থকদের দিয়ে করিয়েছেন প্রতিবাদ সমাবেশ।

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘২০ মাস ধরে ফারুক চৌধুরীর অসম্মতির কারণে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের কোনো সভা করা যায়নি। আমাদের রাজনীতিতে অনেকটা অচলাবস্থা বিরাজ করছে। তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কেন্দ্রে অবহিত করা হয়েছে। তিনি যেহেতু আমাদের চেতনার পরিপন্থী, কাজেই তাঁর সঙ্গে রাজনীতিও করা যায় না।’

এদিকে আইনি নোটিশ প্রদান সম্পর্কে জানতে চাইলে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, একটি পত্রিকা আমার কাছে জানতে চেয়েছিল ফারুক চৌধুরীর অতীত রাজনীতি সম্পর্কে। আমি সেই সময়কার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছি। কিন্তু তিনি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন আইনের বাইরে গিয়ে। আমাকে তিনি আইনি নোটিশ পাঠাতে পারেন না। পাঠাতে হলে ওই পত্রিকাকে পাঠাতে পারতেন। আর তাঁর কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সে বিষয় নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

এত সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারুক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যখন জেলা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, তখন রাজশাহী আওয়ামী লীগে কোনো কোন্দল ছিল না। কিন্তু আসাদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। তিনি এমপি বাদশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজশাহীর রাজনীতি কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছেন। যেন লিটনকেও সরানো যায়। তাঁরা গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।’

ফারুক চৌধুরী আরো বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচির নামে কিভাবে চাঁদাবাজি করা হয়, সেটা সবাই জানে। লক্ষ্মীপুরের ব্যবসায়ীরা আসাদের কারণে অতিষ্ঠ। আমার সম্মতি ছাড়াই তিনি দলীয় কর্মসূচির নামে যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছেন। তিনি আমাকে বলেন আমি নাকি রাজাকারপুত্র। অথচ একাত্তরে আমার বাবার লাশ পাওয়া গিয়েছিল বাবলা বনে। আমি শহীদের পুত্র হয়েও আমাকে শুনতে হয় রাজাকারপুত্র। আবার আমার মা দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিছানাগত। তাঁকে নিয়েও কটূক্তি করেন আসাদ। এসব যন্ত্রণা আমি নিজেই বয়ে বেড়াচ্ছি। একজন বিচারকের কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি। আর নেত্রীর কাছে বিচার দিব। তাঁরাই এর বিচার করবেন।’

ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আমি ১৯৮৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এসেছি। এরপর ’৮৮ সালে রাজশাহীতে ফ্রিডম পার্টির তৎপরতা শুরু হয়। এটা সবাই জানে। তাহলে আমি কিভাবে ওই সময় ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম? এটি কেবলই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত। এর জবাব আমি চেয়েছি। জবাব না দিতে পারলে মামলা করব।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা