kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বগুড়া ডিবির গ্রেপ্তার বাণিজ্য পিছিয়ে নেই থানা পুলিশও

লিমন বাসার, বগুড়া   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বগুড়া ডিবির গ্রেপ্তার বাণিজ্য পিছিয়ে নেই থানা পুলিশও

টার্গেট করা ব্যক্তিকে ধরে এনে প্রথমেই ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো হয়। এরপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। চাহিদামতো টাকা মিললে মামুলি ঘটনার কোনো মামলায় আদালতে চালান করে দেওয়া হয়। আর গ্রেপ্তার ব্যক্তির স্বজনরা অর্থের লালসা পূর্ণ করতে না পারলে বাড়তে থাকে নির্যাতনের মাত্রা। ক্ষেত্রবিশেষে কঠিন কোনো মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। ঠিক এভাবেই চলছে বগুড়ায় পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিবি) গ্রেপ্তার বাণিজ্য। মাদকের কারবার থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তিকেও ধরে এনে ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর মতো ঘটনা রয়েছে। সম্প্রতি আদালতের কাছে অভিযোগ করা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর জবানবন্দি থেকে এমন সব তথ্য জানা গেছে।

বগুড়া জেলা জজ নরেশ চন্দ্র সরকারের কাছে গত বৃহস্পতিবার একটি অভিযোগ যায় জেলা ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে। এতে উল্লেখ করা হয়, মোটরসাইকেল চোরাচালানি চক্রের সদস্য জামালপুরের মাদারগঞ্জের আহসান উল্লাহসহ আটজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন দিন ধরে বগুড়া ডিবি অফিসে আটক করে রাখেন এসআই শাহীন কাদরী ও এসআই সাইফুল ইসলাম। তিন দিন পর তাদের চালান করা হলে আদালত বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখেন। তাত্ক্ষণিক তলব করা হয় ডিবি পুলিশের ইনচার্জ আসলাম আলীসহ অভিযুক্ত সবাইকে। পরে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে তাঁরা আইন অমান্য করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এর আগে ডিবি পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা না পেয়ে আব্দুল হান্নান নামের এক যুবকের মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ যায় আদালতে। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর ভুক্তভোগীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত। আদালত জানতে পারেন, সাজানো এই ঘটনায় ডিবির অভিযান পরিচালনাকারী টিমের কর্মকর্তা এসআই ফরহাদ সরকার মামলার বাদী হয়েছেন। আর এসআই সাইফুল ইসলাম হয়েছেন মামলার তদন্ত (আইও) কর্মকর্তা। এ ক্ষেত্রে ধরে এনে নির্যাতনের কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই এমনটা করা হয় বলে মনে করেন আদালত।

আব্দুল হান্নানের পক্ষে আইনজীবী শেখ রেজাউর রহমান মিন্টু জানান, পুলিশের এমন অপকর্ম জানতে পেরে সদর আমলি আদালতের

বিচারক মেডিক্যাল পরীক্ষার নির্দেশ দেন। এ ক্ষেত্রেও আদালতের নির্দেশনা না মেনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাই হান্নানকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আবার ঘটনা ধামাচাপা দিতে হান্নান ও তাঁর পরিবারকে ভয় দেখানো হয়।

এ ব্যাপারে কথা বললে অভিযানকালে নিজে উপস্থিত না থাকার কথা স্বীকার করেন ডিবির এসআই ফরহাদ হোসেন। আর নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি মিটে গেছে। হান্নানের পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই।’

এর কিছুদিন আগে শহরের বাসিন্দা জলি খাতুন নামের এক মাদক কারবারিকে সাপ্তাহিক চাঁদা (হপ্তা) না দেওয়ায় গ্রেপ্তার করেন ডিবির এসআই বরকত আলী ও এসআই শাহীন কাদরী। এরপর দালালের মাধ্যমে জলির কাছ থেকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে চালান করা হয়। বিষয়টি জানতে অভিযুক্ত এসআই বরকত ও এসআই শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ডিবি পুলিশের ইনচার্জ আসলাম আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘কিছু টাকা নিয়েছে বলে শুনেছি। আর যেহেতু সে মাদক কারবারি সে কারণে তার কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। অভিযুক্ত এসআইদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু সেই ব্যবস্থা পরে আর নেওয়া হয়নি।

পৃথক ঘটনায় দুই মাস আগে বগুড়ার শেরপুরে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির একটি টিম। পরে ইয়াবা দিয়ে জনপ্রতি ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে তাদের চালান করা হয়।

ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে এমন আরো অর্ধশতাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশি হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে রাজি হয়নি। অনেকেই আবার হয়রানির ঘটনা জানালেও নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

শাজাহানপুর প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাতেও গ্রেপ্তার বাণিজ্যের তথ্য পেয়েছেন। দেখা গেছে, থানার পুলিশের এসআই ওহিদুজ্জামানেরই রয়েছে হাফ ডজনের বেশি গ্রেপ্তার বাণিজ্যের ঘটনা। জানুয়ারির মাঝামাঝিতে উপজেলার জোড়া স্ট্যান্ড থেকে তারাজুল, শাকিল ও সাগর নামে তিন ব্যক্তিকে আটক করে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি ৩৪ ধারায় চালান করেন। ১ ফেব্রুয়ারি গোহাইল স্ট্যান্ড থেকে একই ধরনের অভিযোগে নন্দীগ্রামের আব্দুল আলিম, রাজু আহমেদ ও লিলু নামের তিনজনকে আটক করে ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে ৩৪ ধারায় চালান করেন এই এসআই। একই মাসের ১৪ তারিখে লিচুতলা থেকে কলেজছাত্র সজীব, দিনমজুর ইসরাফিল ও টিএমএসএসের কর্মচারী নাসেরকে আটক করে ১৫ হাজার টাকা আদায় করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। দুই দিনের ব্যবধানে আতাইল বাজারে গোহাইল ইউনিয়নের সহকারী কাজী আব্দুল করিমকে ধরে বাল্যবিবাহ রেজিস্ট্রির অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি দেখিয়ে আট হাজার টাকা আদায় করা হয়। অবশ্য ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে পরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে টাকা ফেরত দেন ওহিদুজ্জামান। আবার ২৭ ফেব্রুয়ারি আতাইল বাজার থেকে শুভ চন্দ্র নামের একজনকে মাদকসহ আটকের পর ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ৩৪ ধারায় চালান করা হয়।

এ ছাড়া ৩০ মার্চ রানীরহাট এলাকায় মাদক সেবনের অভিযোগে নাইস ও আবুল হোসেন নামের দুজনকে আটক করেন ওহিদুজ্জামান। পরে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে নাইসকে ৩৪ ধারায় চালান করা হয়। আর আবুল হোসেনকে থানা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার ৬ আগস্ট রাতে শাকপালা এলাকা থেকে মদ সেবনের দায়ে সাতজনকে আটক করে ৬০ হাজার টাকা আদায় করেন তিনি।

তবে এসআই ওহিদুজ্জামান দাবি করেন, তিনি কোনো গ্রেপ্তার বাণিজ্য করেননি। যাদেরকে ধরা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ না হওয়ায় পরে ৩৪ ধারায় চালান করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার বাণিজ্যে পিছিয়ে নেই শাজাহানপুর থানার দুই এএসআই আলম ও রেজওয়ান। তাঁরা মে মাসের শেষের দিকে উপজেলার পারতেখুর গ্রাম থেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে একটি মোটরসাইকেলসহ রনি নামের একজনকে আটক করলেও পরে লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশ্য অভিযুক্ত দুজনই টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

পৃথক ঘটনায় ২৯ জুন খরনা বাজার থেকে পলাশ নামে এক অটো টেম্পোর চালককে মাদকসহ আটক করেন এসআই মাসুদ রানা। পরে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ৩৪ ধারায় চালান করা হয়। এই এসআইও অন্যদের মতোই টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

একই মাসে নন্দীগ্রাম উপজেলার দোলাসিংড়া গ্রাম থেকে দুই যুবককে আটক করেন এসআই নূর ইসলাম। পরে ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে তাদের ৩৪ ধারায় চালান করা হয়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসআই নূর ইসলাম বলেন, ‘অনেক আগের কথা, তেমন মনে নেই।’

শাজাহানপুর সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আল-আমীন পুলিশের এই গ্রেপ্তার বাণিজ্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘থানার পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা একের পর এক নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চাহিদামতো টাকা দিতে পারলে থানা থেকেই খালাস, অন্যথায় মাদক মামলায় জড়িয়ে চালান করা হচ্ছে।’

গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে শাজাহানপুর থানার কৈগাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। সেখানে গত দুই মাসে ৩৪ জন নিরপরাধ মানুষকে আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শাজাহানপুর থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, ‘তিন-চার মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এর আগে কী হয়েছে বলতে পারব না। তবে আমার যোগদানের পর কোনো অফিসার এ ধরনের কাজ করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে। পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল ইউনিট। এখানে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযুক্তদের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা