kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নেশার টাকা না পেয়ে মাকে পুড়িয়ে হত্যা

‘এমন কুলাঙ্গার যেন কারো ঘরে জন্ম না নেয়’

ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘এমন কুলাঙ্গার যেন কারো ঘরে জন্ম না নেয়’

সোহানুর রহমান খোকন

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় নেশার টাকা না পেয়ে খুকি বেগম (৬৫) নামের এক গৃহকর্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে তাঁর ছেলে সোহানুর রহমান খোকন (২৯)। নিহত খুকি বেগম উপজেলার চিকাশি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের আব্দুস ছামাদ মণ্ডলের স্ত্রী। গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে গজারিয়া গ্রামে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

মাতৃহন্তারক খোকনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কৃষক আব্দুস ছামাদের ১২ বিঘা জমি ছিল। দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে সুখেই কাটছিল সংসার। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সোহানুর রহমান খোকন সবার ছোট। নবম শ্রেণিতেই লেখাপড়ায় ইতি টানা বেপরোয়া স্বভাবের খোকন প্রায় তিন বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিল। তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে রয়েছে।

মাদকাসক্তির সূত্রে ২০১৮ সালে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় খোকন। কিন্তু জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর মাদক সেবনের মাত্রা বেড়ে যায়। তখন থেকেই মাদক কেনার টাকার জন্য মা-বাবাকে নির্যাতন করে আসছিল। একপর্যায়ে মা-বাবা তাকে থানায় সোপর্দ করে। দ্বিতীয় দফায় জামিনে মুক্তি পেয়ে সে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে তাকে দিতেন মা-বাবা। চাহিদামতো টাকা না দিলেই তাঁদের ওপর চলত অমানবিক নির্যাতন। গত দুই বছরে ছেলের মাদক কেনার টাকার জোগান দিতে প্রায় ছয় বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে বাবা আব্দুস ছামাদকে। এতে একসময়ের সচ্ছল ছামাদের সংসারে অভাব দেখা দেয়।

এদিকে প্রতিদিনের মতো রবিবার বিকেলে মাদক কেনার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দাবি করে খোকন। কিন্তু টাকা দিতে ব্যর্থ হলে খাটের সঙ্গে মায়ের হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করতে থাকে। একপর্যায়ে খোকন নিজের মোটরসাইকেল থেকে পেট্রল বের করে মায়ের শরীরে ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুহৃর্তে খুকি বেগমের শরীরের ৯০ শতাংশ ঝলসে যায়। পরিবারের লোকজন উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নেওয়ার পথে সন্ধ্যা ৭টার দিকে মারা যান তিনি। এদিকে ঘটনার পর বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টাকালে স্থানীয় লোকজন খোকনকে আটকে ধোলাই দিয়ে থানায় সোপর্দ করে। বর্তমানে সে পুলিশ পাহারায় ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।

খোকনের স্ত্রী শেফালী খাতুন বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে আমার স্বামী মাদকাসক্ত। প্রতি রাতেই নেশা করে বাড়ি ফিরে আমাকে নানাভাবে নির্যাতন করে। সইতে না পেরে সন্তানদের নিয়ে সাত মাস ধরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। মাকে পুড়িয়ে হত্যাকারী আমার পাষণ্ড স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

অশীতিপর আব্দুস ছামাদ মণ্ডল বলেন, ‘ছেলেকে ভালো করতে থানায় সোপর্দ করেছি, পারিবারিকভাবে দফায় দফায় বৈঠক করে ব্যর্থ হয়েছি। মাদকের টাকা না দিলে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মারপিট করত। বাধ্য হয়ে দিনে দিনে ছয় বিঘা জমি বিক্রি করে তাকে মাদক কেনার টাকা দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রবিবার বিকেলে আমার স্ত্রীকে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখে মাদক কেনার টাকা ধার করতে পাশের বাড়ি যাই। সেখান থেকে বাড়ি ফিরে দেখি স্ত্রীর শরীরে ছেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। দুই ঘণ্টা পর আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমার সন্তানের মতো এমন কুলাঙ্গার সন্তান যেন আর কারো ঘরে জন্ম না নেয়। এ জন্য প্রশাসনের কাছে আমার ছেলের মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি।’

ধুনট থানার ওসি ইসমাইল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, নেশার টাকা না পেয়ে মাকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে সোহানুর রহমান খোকন। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শজিমেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা