kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আক্রান্তের তুলনায় এবার মৃত্যুর হার কম

তৌফিক মারুফ   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আক্রান্তের তুলনায় এবার মৃত্যুর হার কম

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই দু-চারজন করে মারা যাচ্ছে। মৃতদের স্বজন ও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্র থেকে গণমাধ্যমে এমন খবর আসছে। সরকারের ডেঙ্গু মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটির হাতেও এবারে মোট তথ্য এসেছে ১৮৮ জনের। আর বেসরকারি হিসাব মতে এই সংখ্যা ২০০ জনের কাছাকাছি।

এত মৃত্যুর খবরের পরও দেশে গত ১৯ বছরের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এ বছর আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যু তুলনামূলকভাবে কম। এটাকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতির ফল বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণাসহ নানা কার্যক্রমের ফলে এবার মানুষ ডেঙ্গুর সামান্যতম উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটেছে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসাকেন্দ্রে। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তদের একটি অংশ চিকিৎসার আওতায় এসেছে। এর পরও যাদের মৃত্যু ঘটেছে তাদের বেশির ভাগের ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্যান্য জটিলতা ছিল। তবু দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসায় এ পর্যন্ত ৯৪ শতাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। আর ৫ শতাংশের বেশি রোগী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মৃত্যুর হার এক শতাংশেরও নিচে; যা ২০০০ সালে ছিল ১.৬৭ শতাংশ, ২০০১ সালে ১.৮১ শতাংশ এবং ২০০৩ ছিল ২.৫ শতাংশ। এমনকি গত বছরের তুলনায়ও এ বছর মৃত্যুর হার কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসকরা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সব ধরনের চেষ্টা করেন। সরকারের জায়গা থেকেও এবার ডেঙ্গু রোগীদের সেবায় অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এর পরও প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। তবে এসব মেনে নিয়েও প্রতিটি রোগের মৃত্যুরই পরিসংখ্যানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় রোগ প্রতিরোধে গতিপথ ঠিক রাখতে। সেই আঙ্গিকে অবশ্যই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার আক্রান্ত বহুগুণ বেশি হলেও মৃতের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম রাখা গেছে। এটা মানুষের সচেতনতা ও চিকিৎসক-চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অগ্রগতির অন্যতম নমুনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০০০ সাল থেকে শুরু করে গত ১৯ বছরের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য নিয়ে কালের কণ্ঠ’র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত ১০ বছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার এবারের চেয়ে বেশি ছিল। গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত এবার আক্রান্ত ৭১ হাজার ৯৬২ জন আর ১৮৮ জনের মৃত্যুর তথ্য আইইডিসিআরের কাছে এসেছে। বেসরকারি হিসাব ধরে ওই সংখ্যা ২০০ জন করলেও মৃত্যুর হার দাঁড়ায়  ০.২৭ শতাংশ। আর সরকারি হিসাবের ১৮৮ জনের মধ্যে এ পর্যন্ত ৯৬ জনের মৃত্যু তথ্য পর্যালোচনায় ৫৭ জন বা ৬০ শতাংশের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ওই ১৮৮ জনের মধ্যে ৬০ শতাংশ হারে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ১২০ হলেও এবারের মোট আক্রান্তের সঙ্গে তুলনামূলক হার দাঁড়ায় ০.১৬ শতাংশ।

সরকারি হিসাবের ১৮৮ জনের মধ্যে এ পর্যন্ত ৯৬ জনের মৃত্যু তথ্য পর্যালোচনায় ৫৭ জনের বা ৬০ শতাংশের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ওই ১৮৮ জনের মধ্যে ৬০ শতাংশ হারে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ১২০ হলেও এবারের মোট আক্রান্তের সঙ্গে তুলনামূলক হার দাঁড়ায় ০.১৬ শতাংশ। আর বিগত প্রতিটি বছরেই সংখ্যাটি এর চেয়ে বেশি ছিল।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের পরিচালক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোগতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর আনুপাতিক হার দেখতে হয়। যেমন আমরা মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু কিংবা অন্যান্য কারণে মৃত্যুর হার নিরূপণ করে থাকি পরবর্তী করণীয় এবং মৃত্যু রোধে আরো অধিকতর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘আমরা সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হলে তো আর এ থেকে মৃত্যু হতো না; চিকিৎসারও প্রসঙ্গ আসত না। পরিবেশগত কারণে কিংবা পর্যাপ্তভাবে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা রোধ করতে না পারায় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে মশা নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়, এটার জন্য অন্য বিভাগ রয়েছে। তবু আমরা রোগ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে মশা নিয়ন্ত্রণেও নিয়মিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি।’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘মৃত্যু হার তুলনামূলক কম বলে আমরা স্বস্তিতে নেই বা থাকতেও চাই না। আমাদের লক্ষ্য ডেঙ্গু থেকে কেউ যাতে মারা না যায়, সবাইকে যাতে বাঁচাতে পারি।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ৮৬৫ : এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল সকাল ৮টার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬৫ জন, যা আগের দিনে ছিল ৯০২ জন। আর হাসপাতাল ছেড়ে গেছে এক হাজার ১৮৫ জন, আগের দিন ওই সংখ্যা ছিল ৫৯২ জন।

অন্যদিকে ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৭১ হাজার ৯৬২ জন। তাদের মধ্যে বাড়ি ফিরে গেছে ৬৭ হাজার ৮৪৩ জন বা ৯৪ শতাংশ রোগী। গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল তিন হাজার ৯৩১ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৩৯৬ জন, যা আগের দিন ছিল ৪০৫ জন এবং ঢাকার বাইরে ৪৬৯ জন, যা আগের দিন ছিল ৪৯৭ জন।

রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ৮২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। একই সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ২৬ রোগী ভর্তি হয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, যা আগের দিন ছিল ৩৩ জন। আর বিভাগ হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে খুলনায় ১৩৭ জন, যা আগের দিন ছিল ১৩৩ জন। অন্যদিকে জেলা হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৬৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে যশোরে। 

আরো একজনের মৃত্যু : এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসান ফকির (৪৫) নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি পুরান ঢাকার মদিনা গ্রুপের নিরাপত্তা প্রহরী ছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা