kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গামা রশ্মি দিয়ে মশা চাষে প্রথম ধাপে সাফল্য!

► পুরুষ মশাকে প্রজনন অক্ষম করা হচ্ছে
► ডেঙ্গুতে আরো ৪ মৃত্যু

তৌফিক মারুফ   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গামা রশ্মি দিয়ে মশা চাষে প্রথম ধাপে সাফল্য!

পরীক্ষামূলকভাবে হলেও ডেঙ্গুপ্রতিরোধী মশা চাষের প্রাথমিক ধাপে সাফল্য মিলেছে সাভারে পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণাগারে। স্ট্রেরেইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) পদ্ধতিতে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে পুরুষ মশাকে প্রজনন অক্ষম করে দেওয়া হচ্ছে ওই মশার খামারে। গত ৩ আগস্ট এ কাজ শুরু করেছিলেন ওই গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিকভাবে বায়োলজিক্যাল ইনসেক্ট কন্ট্রোল মেথডে এই পরীক্ষামূলক কাজে সম্প্রতি ঢাকায় এসে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি বিশেষজ্ঞদল।

গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত একাধিক সূত্রে জানা যায়, খামারে চাষ করা মশা ছেড়ে দেওয়া হবে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় এডিস মশার ভেতর। এতে ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী নারী এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের উদোগে পাইলট প্রকল্প আকারে চলমান এ কাজে পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও যুক্ত আছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের উপব্যবস্থাপক ডা. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, এরই মধ্যে এসআইটির আওতায় মশা চাষের প্রথম এক ধাপের কাজ শেষ হয়েছে। তবে এখনো দুই-তিন বছর লাগবে চূড়ান্ত সাফল্য-ব্যর্থতা নিরূপণ করতে। তিনি জানান, পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ঢাকার আশেপাশে আরো দুই-তিনটি জেলায় গবেষণাকাজ চালানো হবে।

এদিকে পরমাণু শক্তি কমিশন সূত্রে জানা যায়, মশা ব্যবস্থাপনা গবেষণা কর্মসূচির আওতায় মশা নিয়ন্ত্রণের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে এডিস ও কিউলেক্স মশার লার্ভা নিধনকারী জৈব বালাইনাশক উদ্ভাবনের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন আগে থেকেই।

পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ ইনস্টিটিউটের ইনসেক্ট বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আফতাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে মশার ওপর গামা রশ্মি প্রয়োগের ঘটনা এই প্রথম। প্রাথমিক ধাপেই সাফল্য এসেছে এই চাষাবাদে। আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি আছে। মাঠে গিয়ে কোন এলাকায় মশার সংখ্যা কী তা নির্ধারণ করতে হবে, এরপর সেই অনুপাতে গামা রশ্মি প্রয়োগ করা মশা ছেড়ে দেওয়ার পরীক্ষা চালানো হবে। এর আগে ল্যাব পর্যায়ে আরো কিছু প্রক্রিয়া আছে।

এদিকে দেশে ক্রমেই কমে আসছে ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব। দেশের আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে গতকাল শুরু হওয়া সেপ্টেম্বর মাসকে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ সময় বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে ক্ষেত্রে এবার গত জুলাই ও আগস্ট মাসে আগের যেকোনো বছরের চেয়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বেশি থাকায় এবার সেপ্টেম্বর নিয়ে ভয় আরো বেশি আছে সব মহলেই। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরো চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই ঢাকাসহ সারা দেশে আমাদের কাজ চলছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, গাইডলাইন অনুসরণ, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুই আমরা করছি। সেই সঙ্গে এডিস মশা প্রতিরোধেও আমরা বিভিন্ন সংস্থাকে সহায়তা করে যাচ্ছি। সার্ভে করে কোথায় কোথায় এডিসের ঘাঁটি বেশি আছে তা যেমন খুঁজে দিচ্ছি, তেমনি নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে আমরা একত্রে কাজ করছি। যার মধ্যে অন্যতম উদ্যোগ হচ্ছে এসআইটির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টের শেষ ভাগে এসে পর্যায়ক্রমে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি ঘটেছে। তবে বর্তমানে যে আক্রান্তের সংখ্যা আছে তা আগের বছরগুলোর এই সময়ের অনুপাতে বেশি। সেদিক থেকে এবার চলতি মাসেও আক্রান্ত হয়তো আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি থাকতে পারে, কিন্তু চলতি বছরের গত দুই মাসের তুলনায় অনেকটাই কম থাকবে বলে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকে অনুমান করছি। সেই সঙ্গে আমরা অধিকতর ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজ করে যাচ্ছি।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ৯০২ : আগের দিন সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৭৬০ জন হলেও এক দিনের মাথায় তা বেড়ে ৯০২ জনে উঠেছে। আর হাসপাতাল ছেড়ে গেছে ৫৯২ জন। অন্যদিকে ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা ৭১ হাজার ৯৭। বাড়ি ফিরে গেছে ৬৬ হাজার ৬৬৮ জন। গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল চার হাজার ২৫৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল সকাল ৮টার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৪০৫ জন, যা আগর দিন ছিল ৩৪৯ আর ঢাকার বাইরে ৪৯৭ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ৪১১ জন। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯২ জন, যা আগের দিন ছিল ৫৬ জন। একই সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩৩ জন, যা আগের দিন ছিল ৩২ জন। আর বিভাগ হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে খুলনা বিভাগে ১৩৩ জন, যা আগের দিন ছিল ১২১।

আরো ৪ জনের মৃত্যু : এদিকে গতকাল ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক শিশুর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে তার স্বজনরা। এ ছাড়া শনিবার রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অপু (১৮) নামের এক তরুণের মৃত্যু ঘটেছে। সাভার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শনিবার রাতে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় খাদিজা আক্তার নামের এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আশুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের স্ত্রী। এ ছাড়া শনিবার রাতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজে চিকিত্সাধীন অবস্থায় যশোরের কেশবপুর এলাকার আব্দুল কুদ্দুস গাজীর মৃত্যু ঘটেছে বলে আমাদের কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা