kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজশাহীতে কাউন্সিলরের কাণ্ড

বাঁকা রাস্তার কবলে অসহায় পরিবার

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঁকা রাস্তার কবলে অসহায় পরিবার

রাজশাহী নগরীতে হাঁটার রাস্তাটি সোজা তৈরি করলে এক প্রভাবশালীর জায়গার ওপর দিয়ে যেত। তাই রাস্তাটি বাঁকা করে তৈরি করা হয়েছে। এতে একটি পরিবারের শেষ সম্বল দুই কাঠা জমির প্রায় সবটুকুই রাস্তার দখলে গেছে। ওই পরিবারের মূল ব্যক্তি নগরীর রামচন্দ্রপুর এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম হোসেন হিরা জটিল বোন টিউমার, রক্তনালির টিউমারসহ নানা রোগে ভুগছেন। ছয় মাস পর পর ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করছেন। এতে প্রচুর টাকা ব্যয় হওয়ায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। এখন বাকি সম্বল স্ত্রীর মালিকানাধীন ওই এক খণ্ড জমি বিক্রি করতে চান তিনি। কিন্তু স্থানীয় কাউন্সিলর আরমান আলীর একগুঁয়েমির কারণে পারছেন না। তাই চিকিৎসার খরচও আর জোগাতে পারছেন না।

নতুন তৈরি করা পায়ে হাঁটা রাস্তাটির পাশ দিয়েই রয়েছে প্রায় ১৭ ফুট প্রস্থের কার্পেটিং করা পাকা রাস্তা। তাই নতুন হাঁটাপথ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সেখানকার মানুষ। ইব্রাহীম হোসেনের অভিযোগ, রাজশাহী সিটি করপোরেশন বা রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) প্ল্যানে না থাকা সত্ত্বেও ওই জমির বড় একটি অংশ দখল করে পায়ে হাঁটার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন কাউন্সিলর। তাঁদের কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। আবার মাত্র দুই কাঠা জমির বেশির ভাগই দখল করে রাস্তা করায় জমির বাকি সামান্য অংশ কেউ আর কিনতে চাচ্ছে না।

ইব্রাহীম উপায়ান্তর না পেয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টির সুরাহা চেয়ে একটি লিখিত আবেদনও করেছেন। কিন্তু এখনো কারো কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। এ অবস্থায় তিনি শেষ ভরসা হিসেবে ফেসবুকে নিজের পেজ থেকে আকুল আবেদন জানিয়ে একটি পোস্ট লিখেছেন। পোস্টে তাঁর স্ত্রীর জায়গা দখল করে বাঁকা করে নির্মাণ করা পায়ে হাঁটা রাস্তার একটি ছবিও তুলে ধরেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নগরীর রামচন্দ্রপুর বাশার রোড এলাকায় সদ্য নির্মাণ করা পায়ে হাঁটার ওই রাস্তাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ইব্রাহীম হোসেনের স্ত্রী তোহরুন নেসার জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ রাস্তাটি সোজা করে করা হলে স্থানীয় প্রভাবশালী তাহা মিঞার জায়গার ওপর দিয়ে যেত। কিন্তু তাহা মিঞার প্রভাবের কাছে পরাজিত হয়ে কাউন্সিলর আরমান আলী বাঁকা করে রাস্তাটি নির্মাণ করেন। এটি করতে গিয়ে প্রায় এক দশমিক ২৫ কাঠা জায়গা দখল করা হয়েছে তোহরুন নেসার।

হযরত আলী নামে সেখানকার এক ব্যক্তি বলেন, ‘যে রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়েছে, তার পাশ দিয়েই রয়েছে প্রায় ১৭ ফুট প্রস্থের কার্পেটিং করা পাকা রাস্তা। ওই রাস্তা থাকা সত্ত্বেও কাউন্সিলর একগুঁয়েমি করে প্রকল্পের নামে টাকা আত্মসাৎ করতেই অসহায় ইব্রাহীম হোসেনের স্ত্রীর জায়গা দখল করে রাস্তাটি নির্মাণ করেছেন। আবার রাস্তাটি যদি নির্মাণ করতেই হয়, তাহলে তাহা মিঞার জমির ওপর দিয়ে যেত। কিন্তু তাহা মিঞাদের প্রভাবের কারণে সেটি না করে কাউন্সিলর ইচ্ছামতো অসহায় একটি পরিবারের জায়গা দখল করে রাস্তাটি নির্মাণ করেছেন। এ নিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে।’

ইব্রাহীম হোসেন জানান, ছয় মাস পর পর ভারতে গিয়ে চি?কিৎসার জন্য ধার?দেনায় এবং এনজিও ঋণে তিনি জর্জ?রিত। ব্যাংক থে?কে ঋণ ?নি?য়েও তিনি শোধ দিতে না পেরে এখন খেলাপির খাতায়। এই অবস্থায় স্ত্রীর ওই জমিটুকু নিজের চিকিৎসা করানো, ঋণ পরিশোধ করা, সংসার চালানো এবং দুই সন্তা?নের পড়ালেখার খরচ জোগানোর উপায় হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে। জমিটি বিক্রি করারও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু রামচন্দ্রপুর মৌজার জেএল-১৪, দাগ নং-১২৭৫-এর ওই জমিটির অনেকটা অংশ রাস্তার দখলে যাওয়ায় সেটি আর বিক্রি করতে পারছেন না।

এ নিয়ে বারবার নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউ?ন্সিল?র আরমান আলীর কা?ছে ধরনা দি?য়েছেন ইব্রাহীম হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তোহরুন নেসা। কিন্তু কোনো লাভ হয়?নি। বাধ্য হ?য়ে রাসিকের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে দেখা করে তোহরুন নেসা গত ২৮ আগস্ট তাঁর জমিটি ফিরে পেতে লিখিত আবেদন করেছেন। মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। পরিবারটি মেয়র লিটনের দিকেই তাকিয়ে আছে।

তোহরুন নেসা বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন হয়ে আছে যে এখন মেয়র সাহেবই আমাদের পরিবারটিকে বাঁচাতে পারবেন। না হলে স্বামীকে যেমন হারাতে হবে, তেমনি দুই সন্তান নিয়ে আমাকে পথে নামতে হবে। এর বাইরে কোনো উপায় নেই আমার। শেষ সম্বল একমাত্র জমিটি কাউন্সিলর জোর করে দখল করে নেওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছি আমি।’

জানতে চাইলে কাউন্সিলর আরমান আলী বলেন, ‘প্রয়োজনের জন্যই রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ দেখার সুযোগ নেই।’

মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে প্রয়োজনে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা