kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইয়াবার নতুন রোড রৌমারী

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইয়াবার নতুন রোড রৌমারী

সর্বনাশা মাদক ইয়াবার বিরুদ্ধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে অনেক আগেই। কিন্তু দেশে কিছুতেই যেন ইয়াবার প্রবেশ বন্ধ হচ্ছে না। ইয়াবার বিস্তার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। কঠোর নজরদারি ও অভিযানের মুখে মাদক চোরাকারবারিরা ইয়াবা পাচারের চিহ্নিত রুট টেকনাফ ছাড়াও অন্যান্য নয়া রুট ব্যবহার করতে শুরু করেছে—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দারা এমন আশঙ্কা করছিলেন। সম্প্রতি ঢাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালানসহ ভারতীয় এক নাগরিক গ্রেপ্তার হয়। এ সময় আরো আটক হয় স্থানীয় দুই মাদক ব্যবসায়ী। আটক ব্যক্তিরা গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করেছে যে ইয়াবার নতুন রুট হিসেবে রৌমারী সীমান্তকেও বেছে নিয়েছে তারা। অর্থাৎ পুলিশ ও গোয়েন্দাদের আশঙ্কার সত্যতা পাওয়া গেছে।

গত ৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উত্তর বিভাগ ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে ভারতীয় নাগরিক আব্দুস সবুর মিয়াকে। জিজ্ঞাসাবাদে আসামের বাসিন্দা ওই ব্যক্তির জবানিতে ইয়াবা পাচারের নয়া রুট সম্পর্কে জানা যায়। সবুর জানায়, সে নিজেও ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে বাংলাদেশে। এরপর প্রতি পিস ইয়াবা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে ভারতীয় ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, যা বাংলাদেশি ঢাকায় দাঁড়ায় ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। ইয়াবার এসব চালান আসাম থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাচার করা হয়। ভারতীয় ওই নাগরিকের সঙ্গে গ্রেপ্তার হয় বাংলাদেশি দুই মাদক কারবারি জাকির হোসেন ও শামসুল আলম। এদের মধ্যে জাকির হোসেনের বাড়ি রৌমারীর সীমান্ত এলাকা তেকানি গ্রামে।

গ্রেপ্তার মাদক কারবারিদের দেওয়া তথ্য মতে, রৌমারী সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে ভারতীয় অংশ থেকে ইয়াবার চালান তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশি চোরাচালানিদের হাতে। এখান থেকে ইয়াবার চালান চলে যায়

সারা দেশে। সীমান্তবাসী এবং ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ইয়াবা পাচারের ভয়াবহ তথ্য। স্থানীয় এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর তথ্য মতে, রৌমারী সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ লাখ ইয়াবা ঢোকে বাংলাদেশে। সীমান্ত এলাকার কোনো কোনো বাংলাদেশি একাই ৫০ হাজার ইয়াবার চালান কিনে নেয়। আর ছোট ব্যবসায়ীরা পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার পিস নেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত থেকে সীমান্ত পার করাসহ ১০০ পিস ইয়াবা বাংলাদেশে আনতে খরচ হয় ছয় হাজার থেকে ছয় হাজার ২০০ টাকা। স্থানীয়ভাবে যা হাতবদল হয় সাড়ে সাত থেকে আট হাজার টাকায়।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, রৌমারীর সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এলাকার প্রায় ৫০ কিলোমিটার (আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ১০৭০ মাখনেরচর থেকে ১০৫১ পিলার শিশুমারা পর্যন্ত) এলাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে ইয়াবা পাচার করা হয়। সীমান্তের একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই ৫০ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে ইয়াবা পাচারের চিহ্নিত রুটগুলো হলো মাখনেরচর, আলগারচর, খেওয়ারচর, নওদাপাড়া, গয়টাপাড়া, খাটিয়ামারী, ছাটকরাইবাড়ী, ধর্মপুর ও চরেরগ্রাম। এসব রুট দিয়ে দিন-রাতের যেকোনো সময় প্রায় নির্বিঘ্নে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশি সীমান্তের এক ইয়াবা ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সীমান্তে ভারতের অংশে যেসব এলাকায় মুসলমানদের বসতি মূলত সেই সব রুট দিয়ে ইয়াবা পাচার করা হয় বেশি। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের হাতে রয়েছে বাংলাদেশি মোবাইল ফোন কম্পানির সিম। ভারতীয়দের হাতে বাংলাদেশি ওই সব মোবাইল নম্বরে রিচার্জ করা হয় বাংলাদেশ থেকে। ইয়াবা পাচার করতে মূলত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় এপার-ওপারের সঙ্গে। ফোনে খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশি চোরাচালানিরা হাজির হয় কাঁটাতারের বেড়ার কাছে। অন্যদিকে ভারতীয় পাচারকারীরা ওই একই কাঁটাতারের বেড়ার অন্য পারে উপস্থিত হয়ে সুযোগ বুঝে ইয়াবার পোঁটলার ঢিল ছুড়ে মারে বেড়ার ওপর দিয়ে। এ পাশের মাদক ব্যবসায়ীরা ক্ষেতে কাজ করা কামলার বেশ ধরে প্রস্তুত থাকে। বেড়ার ওপর দিয়ে ঢিলের মতো ইয়াবার পোঁটলা ছুটে আসার সঙ্গে সঙ্গে হাতে পেয়ে যায় তারা। ছোট ছোট একেকটি পোঁটলায় থাকে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট। এভাবে একটি স্পটে পাঁচ মিনিটেই থেমে থেমে লাখেরও বেশি ইয়াবা পাচার হয়ে থাকে।’

স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, সীমান্ত দিয়ে পার হওয়ার পর ইয়াবার চালান চলে যায় রৌমারী-ঢাকা রুটের যাত্রীবাহী বাসে। অনেক সময় মালভর্তি ট্রাকেও ওঠানো হয় ইয়াবার চালান। আবার প্রাইভেট গাড়ি, মাইক্রোবাস এবং অ্যাম্বুল্যান্সেও ইয়াবার চালান পাচার করা হয় ঢাকায়। রৌমারী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী বাসগুলোয় কমলাপুর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালান পুলিশ ও বিজিবি জোয়ানরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে বড় ব্যবসায়ীরা রৌমারী থেকে বকশীগঞ্জ পর্যন্ত অটোভ্যানে করে পৌঁছার পর ওখান থেকে যাত্রীবাহী বাসে উঠে চলে যায় ঢাকায়।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানায়, ‘ঢাকায় ইয়াবার প্রচুর চাহিদা। মহাজনের কাছে পৌঁছামাত্রই তারা টাকা পরিশোধ করে দেয়। ঢাকায় ১০০ ইয়াবা বেচা যায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়।’

এদিকে ইয়াবার পাচার বিষয়ে রৌমারী থানার ওসি হাসান ইনাম বলেন, ‘আমরা মাদকের বিষয়ে খুবই তৎপর। কয়েক দিন আগেই ১০ হাজার ইয়াবাসহ ব্যবসায়ী ও মাইক্রোবাস আটক করেছি। প্রতি মাসেই মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার ও ইয়াবার চালান ধরছি। গত তিন মাসে ৩০টিরও বেশি মাদকের মামলা করা হয়েছে। মাদক পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে স্থানীয় জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ সচেতন ও সোচ্চার হলে আমাদের সুবিধা হয়।’

ইয়াবা পাচারের নতুন রুট রৌমারী সীমান্তের নাম প্রকাশ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি। সীমান্ত টহলে কড়াকড়ি চলছে। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিজিবির উদ্যোগে সমাবেশ করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ৩৫ বিজিবি জামালপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শনিবার রৌমারীর ভোলা মোড় চত্বরে বিশাল সমাবেশ করেছি। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন এমপি উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ইয়াবা পাচার বন্ধ করতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে তৎপরতা বাড়াতে বলা হবে।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা