kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন

জাপায় দ্বন্দ্বের মওকা নিতে গিয়ে আওয়ামী লীগেও কোন্দল

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাপায় দ্বন্দ্বের মওকা নিতে গিয়ে আওয়ামী লীগেও কোন্দল

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ (সদর) আসনে উপনির্বাচন ঘিরে দলের ভেতর ও এরশাদ পরিবারে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। মাঠে নেমেছেন দলের একাধিক মনোনয়নপ্রার্থী। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভেতরের এ দ্বন্দ্বকে আসনটি দখলে পাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ সুযোগ নিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার আশায় দলটির স্থানীয় নেতারাও নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন।

আজ রবিবার উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে রংপুর সদর আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সিদ্দিক হোসেন। এরপর আর এ আসনে জেতেনি দলটি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জয় পান বিএনপির রেজাউল হক সরকার রানা। এর পর থেকেই আসনটি ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। ১৯৮৬ সালে শফিকুল গণি স্বপন, ১৯৮৮ সালে মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ২০০১ সালে জি এম কাদের, ২০০৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ২০০৯-এ (উপনির্বাচন) রওশন এরশাদ, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই আসনে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ টানা প্রায় তিন দশক ধরে আসনটি দখলে রেখেছিল জাতীয় পার্টি। গত ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এ আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা রয়েছে আজ। তফসিল ঘোষণা করা হলে দলগুলোকে শিগগিরই প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। এ মনোনয়ন নিয়েই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতারা।

ব্যক্তি এরশাদের জনপ্রিয়তা আর রংপুরবাসীর আবেগের কারণে দীর্ঘদিন এ আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। এখন এরশাদ নেই, পাল্টে যেতে পারে ভোটারদের আবেগ আর ভালোবাসার সমর্থনও। তাই পারিবারিকভাবে, নাকি স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে, তা নিয়ে দলের ভেতর-বাইরে চলছে নানা বিশ্লেষণ।

আর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রংপুর সদর আসনটি আবার দখলে নিতে মরিয়া তাঁরা। কেননা এ আসনটি উত্তরবঙ্গের

 প্রাণকেন্দ্র। গোটা উত্তরবঙ্গে একসময় জাতীয় পার্টির আধিপত্য থাকলেও এখন আর তা নেই। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ। আসনটি পুনরুদ্ধার করতে আওয়ামী লীগের দেড় ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী জোরেশোরে প্রচারণায় নেমেছেন।

জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, দলের কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দল নেতা রওশন এরশাদ তাঁর ছেলে রাহগীর আল মাহী সাদকে প্রার্থী করা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে এরশাদের ভাতিজা সাবেক সংসদ সদস্য হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, ভাগ্নি মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পা, আরেক ভাতিজা মেজর (অব.) খালেদ আখতার ও আমেরিকাপ্রবাসী এরশাদের ছোট ভাই হুসেইন মুহম্মদ মোর্শেদ আপেলও চাইছেন মনোনয়ন। এ ছাড়া রংপুর থেকেও তৃণমূলের দুই নেতা মনোনয়ন চাইছেন। সব মিলিয়ে রংপুর সদর আসনের উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ ছাড়া এরশাদের পরিবারেরই কয়েকজন দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে অনড় অবস্থান গ্রহণ করায় দলের মধ্যে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া কর্তৃত্ব নিয়ে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদকে কেন্দ্র করে দলে দুটি গ্রুপ রয়েছে।

জাতীয় পার্টির ভেতরের এ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে এরশাদের আসনটি দখলে নিতে চায় আওয়ামী লীগ। একাধিকবার জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে রংপুর-৩ সদর আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলেও মহাজোটের খাতিরে পরে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিতে রাজি নয় বলে জানা গেছে।

দলের নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কমপক্ষে দেড় ডজন নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁরা রংপুর নগরীসহ নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়েছেন। সড়কে ঝুলিয়েছেন ব্যানার। অনেকেই দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন পাড়া-মহল্লায়। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জিততে হলে এখানে নৌকা প্রতীকে একজন যোগ্য প্রার্থী দেওয়া দরকার। মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান টুটুল, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, সহসভাপতি দিলশাদ হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য হোসনে আরা লুত্ফা ডালিয়া, রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন, চিকিৎসক নেতা ডা. দেলোয়ার হোসেন, জেলা মহিলা লীগের সাবেক সহসভাপতি রোজি রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, জাতীয় শ্রমিক লীগ মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদসহ আরো কয়েকজন। মনোনয়নপ্রত্যাশী আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেও দেখা গেছে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। কেউ কাউকে ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। এ অবস্থায় স্থানীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

মনোনয়নপ্রার্থী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিগত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু জোটগত কৌশলের কারণে প্রতিবারই তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে হয়েছে। তিনি মনে করেন, এলাকার উন্নয়নে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়া উচিত।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু বলেন, যাঁর সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের যোগাযোগ রয়েছে, দলীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখেন, সংসদে গিয়ে রংপুরের উন্নয়নের কথা বলতে পারবেন মনোনয়ন তাঁরই প্রাপ্য। যাঁরা রংপুরে থাকেন না, তাঁদের মনোনয়ন দিলে কেউ মানবে না।

রংপুরে এরশাদের চেহলাম অনুষ্ঠিত

সারা দেশে গতকাল জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চেহলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। রংপুরের ১৭টি স্থানে চেহলাম হয়। দর্শনা এলাকায় এরশাদের বাসভবন পল্লী নিবাসে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন এরশাদের স্ত্রী জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান ও লিয়াকত আলী খোকা, রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, দলের রংপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির প্রমুখ।

দোয়া মাহফিলের পর রওশন স্বামীর কবর জিয়ারত করেন। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পাশে ছিলেন ছেলে সাদ এরশাদ। দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এরশাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন সাদ এরশাদ। তিনি বলেন, ‘বাবার (এরশাদ) তো অনেক পরিকল্পনা ছিল। অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। সেগুলো শেষ করার জন্য আমি রংপুরে কাজ করতে চাই। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি সদর আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে চাই।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা