kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলামোটরে ফুটপাতে বেপরোয়া বাস

কৃষ্ণার কান্না থামছে না

জহিরুল ইসলাম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কৃষ্ণার কান্না থামছে না

চোখে-মুখে ক্লান্তি হতাশা অনিশ্চয়তা। গতকাল জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে পা হারানো কৃষ্ণা রায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাত্র কয়েক দিন আগেও অফিস আর বাসার কাজ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করা মানুষটিকে কাটাতে হচ্ছে হাসপাতালের শয্যায়। তাই রাতভর দুঃস্বপ্ন আর অতীতের স্মৃতি কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে। কাটা পায়ের ব্যথা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়াচ্ছে মনের ব্যথাও। পায়ের ব্যথায় ঘুমাতেও পারছেন না তিনি। দুর্ঘটনায় পা হারানো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির দুই চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরছে জল। পরিবারের সদস্যরা জানান, চোখ বন্ধ করতেই আঁতকে উঠছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডাব্লিউটিসি) সহকারী ব্যবস্থাপক (হিসাবরক্ষণ) কৃষ্ণা রায় (৫২)। গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে ফুটপাতে বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় পা হারানো কৃষ্ণা রায়ের আজ আরেক দফা অপারেশন করা হবে। এর আগে সকালে বসবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড।

শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে পঙ্গু হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসক অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বলেন, ‘রোগীর অবস্থা এখন আগের মতোই আছে। আগামীকাল (আজ) একটা অপারেশন করা হবে। হাঁটুর নিচের অংশ ফেলে দিয়ে ওপরের অংশ যাতে ভালো থাকে তার প্রটেকশন দেওয়া হবে। সকালে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ডের পর অপারেশন শুরু হবে।’

রোগীর অসহ্য ব্যথা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের রোগীরা সব সময় বলবে ব্যথা হচ্ছে। আসলে মানসিক ও শারীরিক অবস্থার কারণে এমনটা হয়। সারা দিন তো আর ব্যথার ওষুধ দেওয়া যায় না। যতটা সম্ভব আমরা তা দিচ্ছি।’

গতকাল শনিবার বিকেলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের (পুরনো ভবন) দ্বিতীয় তলার কেবিন ব্লকের ২১৯ নম্বর কক্ষে নীরবে কান্না করছেন কৃষ্ণা রায়। পাশে থাকা স্বামী রাধে শ্যাম চৌধুরী (৫৫), ছোট বোন সুকলা রায় (৪২) আর ছেলে কৌশিক চৌধুরী (২২) দেখছেন প্রিয় মানুষটির কষ্ট সহ্য করতে না পারার অসহায় আর্তনাদ।

হাসপাতালের শয্যায় কান্না করতে করতে কৃষ্ণা রায় বলেন, ‘ইনজেকশন দিলে ব্যথা কম থাকে। এত ব্যথা মনে হয় সব জ্বলে যাচ্ছে। বসতে পারি না, নড়াচড়া করতে পারি না। অসহ্য যন্ত্রণা, কষ্ট! যার হয় সে বুঝতে পারবে, বলে বোঝাতে পারব না। সামান্য নাড়া লাগলেই ব্যথা শুরু হয়ে যায়। এভাবে থাকা যায়? রাতে ঘুমাতে পারি না, চোখ বন্ধ করলেই সেদিনের সব চোখে ভেসে ওঠে।’

পাশে বসে থাকা ছেলে কৌশিক ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘আমার মায়ের কষ্ট আর দেখতে পারছি না। ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট আমার মাকে কোনো পণ্য ভেবেছে হয়তো! যার জন্য দুই লাখ টাকায় সমাধান চেয়ে আর খবরও নেয়নি। মায়ের উন্নত চিকিৎসা আর অপরাধীদের বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’

গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় করা মামলায় চালক মোর্শেদ, চালকের সহকারী ও মালিক ইয়াসমিন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলার বিষয় উল্লেখ করে কৃষ্ণার স্বামী রাধে শ্যাম চৌধুরী বলেন, ‘মামলা যে করেছি, সে খাতাটাই মনে হয় আর উল্টানো হয়নি। জানি না এখন কী অবস্থা। আর ট্রাস্টের ওরা তো আর খবরও নিল না। মন্ত্রী সাহেব এলেন, এসে বলে গেছেন সব ধরনের সহায়তা দেবে সরকার।’ তবে হাতিরঝিল থানা-পুলিশ বলছে, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার এসআই (তদন্ত কর্মকর্তা) খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। গাড়ির মালিক ইয়াসমিন নামে ওই নারীকে ধরার চেষ্টা চলছে। ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্টের দেওয়া তথ্য মতে প্রযুক্তির সাহায্যে চালককে শনাক্ত করা গেছে। চালককে ধরতে পারলে তার সহযোগীকেও ধরা যাবে।’

কৃষ্ণা রায়কে দেখতে হাসপাতালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী : গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কৃষ্ণা রায়কে দেখতে যান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরী। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি (দুর্ঘটনা) নিয়ে কনসার্ন। আমরা তাঁর চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন তা করব। প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।’ এ সময় বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন। যে কেউ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। তাঁরা যদি বিচার প্রার্থনা করেন তাহলে নিশ্চয়ই বিচার পাবেন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা