kalerkantho

নান্দাইলে সংঘর্ষে প্রতিবাদী যুবক নিহত

‘বাবা শরীরে রক্ত নিয়ে কোথায় গেল ব্যথা হচ্ছে না?’

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বাবা শরীরে রক্ত নিয়ে কোথায় গেল ব্যথা হচ্ছে না?’

ময়মনসিংহের নান্দাইলের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় দুই গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিহত হন লামিম ও তাসিনের বাবা। স্বজনরা কান্নাকাটি করলেও এই দুই শিশু থেকে থেকে প্রশ্ন করছে, ‘বাবা শরীরে রক্ত নিয়ে কোথায় গেল, ব্যথা হচ্ছে না?’ ছবি : কালের কণ্ঠ

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের নান্দাইলের দেওয়ানগঞ্জ বাজারে দুই গ্রামের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম সাইদুল ইসলাম (৪০)। সংঘর্ষ চলাচালে হামলার প্রতিবাদ এবং একটি দোকানে আটকে পড়া লোকদের বাঁচাতে গেলে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গতকাল রবিবার সকালে উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের মহেশকুড়া ও বিরাশি গ্রামের লোকজনের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।

নিহত সাইদুল ইসলাম মহেশকুড়া গ্রামের মো. এজাহার মিয়ার ছেলে। তিনি দেওয়ানগঞ্জ বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সাইদুলের পাঁচ ও সাত বছরের দুটি শিশুপুত্র রয়েছে। হামলার পর আহত বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য দেখে এক শিশুপুত্র বলছিল, ‘বাবা শরীরে রক্ত নিয়ে কোথায় গেল? ব্যথা হচ্ছে না?’

সংঘর্ষে গুরুতর আহতদের মধ্যে পাভেল মাহমুদ (৩০) নামের একজনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো এবং হিমেল মিয়া (২২) নামের আরেকজনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের নান্দাইল, গফরগাঁও হোসেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা করানো হয়েছে।

নান্দাইল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে দেওয়ান বাজারে সংঘর্ষটি ঘটে। ঘটনার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গিয়ে বাজারে গিয়ে বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ পাওয়া যায়। রাস্তাঘাটে ভাঙা ইটের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মানুষের জটলা দেখা গেছে। ঘটনার পর বাজার ও আশপাশের গ্রামগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর মধ্যেই কিছু দূরে মহেশকুড়া গ্রামের একটি বাড়িতে কান্না আর আহাজারির করুণ শব্দ ভেসে আসছিল।

মহেশকুড়া গ্রামের মঞ্জুরুল হক (৫০) জানান, কোরবানির ঈদের পরদিন রাতে দেওয়ানগঞ্জ বাজারে বসে চা পান করছিলেন মহেশকুড়া গ্রামের তিন তরুণ। ওই সময় পাশের বিরাশি গ্রামের মুক্তোল হোসেন মল্লিকের ছেলে ফজলুল হক এসে তাঁদের মুখে টর্চের আলো ফেলে। এর প্রতিবাদ করলে তিনি টর্চ দিয়ে একজনের মাথায় আঘাত করে। ওই ঘটনায় কয়েক দফা উত্তেজনা দেখা দিলে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসা করার উদ্যোগ নেন নান্দাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ জুয়েল।

গতকাল রবিবার ছিল সালিসের বসার দিন। কিন্তু এর আগেই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুক্তোল মল্লিকের লোকজন দেওয়ানগঞ্জ বাজারে প্রবেশ করে মীমাংসার অপেক্ষায় থাকা মহেশকুড়া গ্রামের লোকজনের ওপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে লোকজন বিভিন্ন দোকানে আশ্রয় নিয়ে ভেতর থেকে সাটার বন্ধ করে দেয়। তখন বন্ধ সাটার কুপিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে কোপাতে থাকে বিরাশি গ্রামের লোকজন। এ সময় দেওয়ানগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম তাঁর পরিচিত লোকজনকে বাঁচাতে যান এবং হামলার প্রতিবাদ করতে থাকেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এক তরুণ আরাফাত জানান, তিনি ওই সময় ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন দেখেছেন নিরস্ত্র সাইদুল ইসলামকে ধারালো অস্ত্র তিয়ে কোপাতে থাকে কয়েকজন সন্ত্রাসী। এই অবস্থায় সাইদুল প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলে পাশের একটি ড্রেনে পড়ে যান। পরে সেখানে গিয়ে সন্ত্রাসীরা উপর্যুপরি কুপিয়ে মৃত মনে করে চলে যায়। সংঘর্ষ থামলে সেখান থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় সাইদুলকে উদ্ধার করে হোসেনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তাঁর এই মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিহত সাইদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাক্রুদ্ধ বাবা কোনো কান্নাকাটি ছাড়াই পাথরের মতো বসে আছেন। মা ও স্ত্রী পাগলের মতো বুক থাপড়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছেন। তাঁদের আহাজারিতে উপস্থিত লোকজনও কান্নাকাটি করছে। দুই শিশুপুত্র লামিম (৭) ও তাসিন (৫) সবার কান্নাকাটিতে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। লামিন বলছে, ‘বাবা শরীরে রক্ত নিয়ে কই গেল, আমিও যাব। বাবার ব্যথা হচ্ছে না?’

নান্দাইল থানার ওসি মনসুর আহাম্মদ জানান, হত্যার ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযুক্ত অন্যদের গ্রেপ্তার ও মামলার প্রস্তুতি চলছে।

মন্তব্য