kalerkantho

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীদের অস্ত্রে কোনো গুলি ছিল না

আশরাফ-উল-আলম   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীদের অস্ত্রে কোনো গুলি ছিল না

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার আগে তাঁর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করে খুনিরা। বঙ্গবন্ধু বাড়ির বারান্দায় এসে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘গোলাগুলি হচ্ছে। আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি তোমরা কি করো?’ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, এ বাড়িতে তখন মোট ২৫ জন সেনারক্ষী পাহারা দেওয়ার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেননি তাঁরা।

হাবিলদার আবদুল কুদ্দুস, নায়েক সুবেদার আবদুল মোতালেব, নায়েক আবদুল জলিলসহ ২৫ জন সেনারক্ষী ছাড়াও পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পাহারা দিতেন। প্রতিদিন আটজন করে সেনারক্ষী পাহারায় থাকতেন। পুলিশ সদস্যরা পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের (তৎকালীন ডিএসপি) নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ছিলেন। সেনাবাহিনীর নায়েক সুবেদার আবদুল গনি ছিলেন ওই বাড়ির গার্ড কমান্ডার।

বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য এতসংখ্যক রক্ষী থাকলেও কোনো প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। কারণ তাঁদের কাছে অস্ত্র থাকলেও ব্যবহারের জন্য কোনো গুলি ছিল না। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সিকিউরিটি গার্ডদের কাছ থেকে অস্ত্রের সব গুলি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। 

ওই দিন বঙ্গবন্ধু ভবনে নিয়োজিত গার্ড কমান্ডার নায়েক সুবেদার আবদুল গনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি জানান, ১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট ওই বাড়ির আগের সেনারক্ষীদের সরিয়ে দিয়ে নতুন ২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৫ই আগস্ট ভোর সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ করে ঘাতকরা। এর আগের দিন কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে তৎকালীন সুবেদার মেজর আবদুল ওয়াহাব জোয়ারদার ওই বাড়িতে আসেন সেখানে নিয়োজিত সেনা সদস্যদের বেতন দেওয়ার জন্য। ১৫ই আগস্ট ভোর ৪টার দিকে আবার তিনি ওই বাড়িতে আসেন। কমান্ডার আবদুল গনিকে ডেকে বলেন, ‘তোমাদের গুলিগুলো পুরনো। এগুলো আমাকে দিয়ে দাও। আমি নতুন গুলি দিচ্ছি।’ আবদুল গনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কথার অবাধ্য হতে পারেননি। তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের

ডেকে ‘ফল ইন’ করান। সবার কাছ থেকে গুলি নিয়ে ওয়াহাব জোয়ারদারকে দিয়ে দেন।

আরেক সাক্ষী নিরাপত্তারক্ষী নায়েক মোতালেব তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, কমান্ডার আবদুল গনি তাঁদের ডেকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি নিয়ে ওয়াহাব জোয়ারদারকে দেওয়ার পর তিনি এগুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি একটি গাড়িতে ওঠেন। আবদুল গনি আদালতকে জানান, তাঁরা কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেন নতুন গুলি পাওয়ার জন্য। কিন্তু ওয়াহাব জোয়ারদার কোনো গুলি না দিয়েই কেটে পড়েন।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হাবিলদার আবদুল কুদ্দুস সিকদার সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাঁকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ সময় তিনিও একই তথ্য জানান।

সাক্ষীরা আদালতে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতর পাঁচ-ছয়জন ঢুকে একে একে সবাইকে খুন করে। নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে গুলি থাকলে কাজটি এত সহজ হতো না। তবে তাঁরা এটিও মনে করেন, প্রতিরোধ করলেও একসময় তাঁদের পরাজিত হতে হতো। কারণ বাড়ির বাইরে দু-তিনটি ট্রাকে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরা টহল দিচ্ছিলেন।

আগের দিন থেকেই খুনিরা ওই বাড়ির চারপাশে ছিল

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণের জন্য আগের দিন থেকেই কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ওই বাড়ি রেকি করতে থাকেন। কিন্তু কেউই বুঝতে পারেনি কী ঘটতে যাচ্ছে। গার্ড কমান্ডার নায়েক সুবেদার আবদুল গনি সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আদালতকে জানান, ১৪ই আগস্ট বিকেল থেকেই কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ৩২ নম্বরের বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করেন। তিনি নিজে ১৪ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মেজর (পরে লে. কর্নেল) শরিফুল হক ডালিমকে মোটরসাইকেলে বাড়ির সামনের রাস্তায় টহল দিতে দেখেন। একই দিন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে অ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকে (পরে মেজর) মোটরসাইকেলে বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা