kalerkantho

বংশালের গৃহবধূ উর্মি হত্যা মামলা

আসামিরা প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষদর্শী শিশু অনিম নিরাপত্তাহীন

এম বদি-উজ-জামান   

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আসামিরা প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষদর্শী শিশু অনিম নিরাপত্তাহীন

রাজধানীর বংশালে নিহত গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌস উর্মি হত্যা মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের ছয় বছরের শিশুসন্তান আরাফাত ইসলাম অনিমের জীবন এখন বিপন্ন। নিহতের মা-বাবার (অনিমের নানা-নানি) অভিযোগ, পুলিশের তদন্তে গাফিলতি কারণে মূল অভিযুক্ত নিহত উর্মির স্বামী আজগর আলী ও তার ভাগ্নে রনি জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন মুক্ত। মা হত্যার দগদগে স্মৃতি নিয়ে শিশুটি বড় হচ্ছে। শিশুটি বরাবরই এ হত্যার সঙ্গে তার বাবা জড়িত—এমন কথা বলে আসছে। ‘এ অবস্থায় সে এখন নিরাপত্তাহীন অবস্থার আমাদের কাছে আছে’, যোগ করেন অনিমের নানি।

মামলাটি সিআইডিতে তদন্তের জন্য পাঠাতে পুলিশ সদর দপ্তরের দুই দফায় দেওয়া নির্দেশ অমান্য করেই ডিবি পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। আদালত মামলার তদন্তে তদন্তকারী কর্মকর্তার (ডিবি পুলিশ) অবহেলা ও গাফিলতি পাওয়ায় মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

অনিমের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত আবেদন করেছেন নিহতের মা নুর আক্তার। আবেদনকারীর অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলার প্রধান আসামিদের ছেড়ে দিয়েছেন। মামলায় সঠিকভাবে তদন্ত করেনি ডিবি পুলিশ। তাঁর দাবি, ‘আজগর আলীর সঙ্গে তার ভাবির পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। উর্মি বাধা দিলে এ নিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালাত আজগর আলী। মীমাংসার কথা বলে পারিবারিকভাবে কয়েকবার বৈঠকও হয়েছে; কিন্তু কোনো সুরাহা না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে আজগর আলী আমার মেয়েকে হত্যা করেছে।’ তাঁর অভিযোগ, আজগর আলীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েই মূল তিন আসামিকে ছেড়ে দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

তবে ডিবি পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন পাটোয়ারী তদন্তে গাফিলতির কথা অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে যা পেয়েছি, তাই উল্লেখ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।’ একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী শিশু অনিমকে কেন সাক্ষী করনেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সে শিশু। বাচ্চাদের বক্তব্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা চিন্তার বিষয়। এই শিশু সত্য-মিথ্যা কতটুকু বোঝে তা নিয়েই প্রশ্ন। এ কারণে তাকে সাক্ষী করা হয়নি।’

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির এএসপি আজিজুল হক গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আর তদন্ত কর্মকর্তা নেই। এক সপ্তাহ হলো তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি জহিরুল ইসলাম।’

মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর রাজধানীর বংশালের সুরিটোলা এলাকার লুৎফর রহমান লেনের বাসায় খুন হন উর্মি। এর পরদিন নিহতের বাবা মো. খোকন বাদী হয়ে বংশাল থানায় মামলা করেন। মামলায় আজগর আলী, আজগর আলীর ভাগ্নে রনিকে আসামি করা হয়। মামলার পরদিন ৭ নভেম্বর মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার পরিদর্শক মো. কায়কোবাদ কাজী ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করেন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি মামলার দায়িত্ব পান ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেন পাটোয়ারী। পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিহতের ভাতিজা মাসুদুল ইসলাম ওরফে মাসুদ রানাকে। এই মাসুদ রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেছে, সে একাই এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। আর এর প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী শিশু অনিম। কিন্তু শিশু অনিম বলছে ভিন্ন কথা। অনিমের বক্তব্য অনুযায়ী, তার বাবা আজগর আলী, রনি ও রোকসানা (অনিমের চাচি) এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

এরপর মাসুদ রানাকে একমাত্র আসামি করে ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক। এই অভিযোগপত্রে মামলা থেকে আজগর আলী ও রনিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে গাফিলতি

মাসুদ রানা আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে শিশু অনিমের নাম বলে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা অনিমকে সাক্ষী করেননি। এ অবস্থায় কোনো উপায়ান্তর না দেখে মামলার বাদী ডিবির দেওয়া অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি আবেদন দেন। আদালত তাঁর বক্তব্য শোনার পর নারাজির আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। সিআইডির এএসপি আতাউর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও তদন্তের মাঝপথে তাঁকে ঢাকার বাইরে বদলি করায় দায়িত্ব পড়ে আরেক এএসপি আজিজুল হকের ওপর। তিনিও বদলি হয়ে গেছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন সিআইডির এএসপি জহিরুল ইসলাম। এভাবেই একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হচ্ছেন; কিন্তু উর্মি হত্যার তদন্ত শেষ হচ্ছে না।

অনিম বলছে আমার বাবাই মাকে মেরেছে

উর্মি যখন খুন হন তখন তাঁর ছেলে অনিমের বয়স সাড়ে তিন থেকে চার বছর। তার বয়স এখন ছয় বছর। অনিমের নানি কালের কণ্ঠকে বলেন, অনিম বরাবরই বলে আসছে রনি তাকে চিপস খেতে দিয়ে টিভিতে ডরেমন কার্টুন ছেড়ে দেয়। এর মধ্যেই সে তার মাকে চিৎকার করে বলতে শুনেছে, ‘অনিম, আমাকে বাঁচাও, বাঁচাও।’ সে এগিয়ে দেখেছে, তার বাবা আজগর আলী, চাচি রোকসানা ও রনি তার মাকে বঁটি ও ছুরি দিয়ে মারছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা