kalerkantho

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে চাকরি হারিয়েছিলেন যিনি

‘আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সম্মিলিত প্রতিবাদ হয়নি’

আজিজুল পারভেজ    

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে চাকরি হারিয়েছিলেন যিনি

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ, একজন সরকারি কর্মকর্তা; যিনি প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শুধু প্রতিবাদ নয়, তিনি প্রতিরোধেরও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। নিজের প্রশাসনিক এলাকায় অবৈধ খন্দকার মোশতাক সরকারের কোনো আদেশ কার্যকর হতে দেননি। কারফিউ জারির বদলে সংগঠিত করেছিলেন প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিল। একপর্যায়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেও প্রতিবাদে মুখর ছিলেন। জেলহত্যার প্রতিবাদেও হরতালের ডাক দেন তিনি।

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ ১৯৭৫ সালে ছিলেন বরগুনা মহকুমার প্রশাসক (এসডিও)। বরিশালের সন্তান সিরাজ ১৯৬৯ সালে বরগুনা মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করে প্রথম সাত বছর সেখানেই কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বরগুনা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব কারণে ওই এলাকার জনগণের সঙ্গে তাঁর এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই জনসম্পৃক্ততার কারণেই সরকারি চাকরিতে থেকেও প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাহস দেখিয়েছিলেন।

স্মৃতিচারণা করে সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ বলেন, ‘১৫ আগস্ট ভোরে বাসার দোতলায় বসে আছি। ছাত্রলীগ নেতা আবদুল মোতালেব বাসায় ঢুকে চিৎকার করে জানাল—বঙ্গবন্ধু আর নেই। সঙ্গে সঙ্গে রেডিওটা অন করলাম। শুনলাম মেজর ডালিমের কণ্ঠ, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। সারা দেশে সামরিক আইন ও কারফিউ জারি করা হয়েছে। ঘটনাটি ছিল বজ্রাঘাতের মতো। সিদ্ধান্ত নিলাম, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে হবে। অবৈধ সামরিক সরকারের আদেশ আমরা মানব না।’

সিরাজ উদ্‌দীন বলতে থাকেন—‘প্রতিরোধের শপথ নিয়ে মাঠে নেমে পড়লাম। সঙ্গে নিলাম নিজের রিভলবারটি। প্রথমেই গেলাম মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা এসডিপিও ফারুক আহমদের বাসায়। জানালাম—বঙ্গবন্ধুকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমরা প্রতিবাদ করব। আপনি পুলিশকে রেডি করেন। এরপর গেলাম রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে। প্রতিরোধের ব্যাপারে তাদের সবার আশ্বাস পাওয়া গেল। সব ক্যাম্পে ওরা জানিয়ে দিল যে আমরা বিদ্রোহ করেছি, সামরিক সরকারকে আমরা মেনে নেব না। পটুয়াখালীর রক্ষীবাহিনীকে বিদ্রোহের আহ্বান জানালে তারাও প্রস্তুত হয়। আমাদের পরিকল্পনা—প্রতিরোধের জন্য ঢাকার দিকে মার্চ করব। প্রতিরোধের ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। সামরিক সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করি। বরগুনায় কারফিউ ও সামরিক আইন জারি করিনি।’

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদের ধারণা ছিল দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। টেলিফোনে যোগাযোগ করলেন সিলেট, খুলনা, নওগাঁসহ কয়েকটি জেলা-মহকুমার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে। কিন্তু হতাশ হলেন। রক্ষীবাহিনীও ঢাকায় যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো নির্দেশনা পায়নি।

১৬ আগস্ট মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। এসডিওর বাসায় আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধুর স্মরণে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিলের। তাতে যোগ দেন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বাকশাল তথা আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু এরপর কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়ে। রক্ষীবাহিনী সাত দিন বরগুনা শহর তাদের দখলে রাখে। সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদকে চাকরিচ্যুত করা হয় ২৪ সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন অভিযোগে প্রশাসনিক মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ফলে ১৯৭৭ সালে চাকরিতে পুনর্বহাল হন তিনি।

এদিকে বরখাস্ত হওয়ার পরও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ। ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার খবর ৫ নভেম্বর পাওয়ার পর ৬ নভেম্বর বরগুনায় হরতাল আহ্বান করে এই নৃশংসতার প্রতিবাদ করেন তিনি।

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদ বলেন, বরগুনায় সবাই প্রতিবাদ-যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আওয়ামী লীগ থেকেও না। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও না। আর সারা দেশে সম্মিলিত প্রতিবাদ না হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনবিচ্ছিন্নতা ছিল প্রধান কারণ। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি পেছনে জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ভূমিকা রেখেছে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ এবং কম্বল-রিলিফ চুরির অভিযোগও ভূমিকা রেখেছে। ষড়যন্ত্র তো ছিলই। আরেকটি কারণ ছিল, নবনির্বাচিত জেলা গভর্নরদের ট্রেনিং উপলক্ষে সারা দেশের বেশির ভাগ নেতা ছিলেন ঢাকায়। প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেতা স্থানীয়ভাবে ছিলেন না।

সিরাজ উদ্‌দীন আহমেদের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর বরিশালের বাবুগঞ্জের আরজি কালিকাপুর গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৯ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ নেন। ২০০৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব, বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তিনি বরিশাল বিভাগ সমিতি ঢাকার সভাপতি। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী অধ্যাপিকা ফিরোজা বেগম মারা গেছেন।

মন্তব্য