kalerkantho

বাস ঢাকা ছাড়তেই নাভিশ্বাস

ঈদ যাত্রায় ট্রেনে বিপর্যয়

পার্থ সারথি দাস   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঈদ যাত্রায় ট্রেনে বিপর্যয়

প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যেতে হবে। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে দরজায় ও ছাদে ঝুঁকি নিয়ে ঝুলেই রওনা হয়েছে অনেকে। ছবিটি গতকাল রাজধানীর বিমানবন্দর স্টেশনের। ছবি : কালের কণ্ঠ

শুক্রবার সকাল ১১টা। কমলাপুর রেলস্টেশনে ঈদে বাড়িমুখো যাত্রীসাধারণের ভিড়ে গমগম পরিস্থিতি। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল একতা এক্সপ্রেস। দরজা-জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল যাত্রীরা। পাঁচ-ছয় মিনিটেই দেখা গেল ট্রেনের ভেতরে আর কেউ প্রবেশ করতে পারছে না। জানালায় পা রেখে সাত-আট বছরের মেয়ে জেসমিনকে দুই হাতে

ছাদে ঠেলে দিচ্ছিলেন আরশ আলী। হাত ফসকে গেলেই বিপদ। ট্রেন ছাড়ার আগে আরশ আলী বললেন, ‘টিকিট পাইনি। টাঙ্গাইল গিয়ে নেমে যাব।’ একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১০টা। দেড় ঘণ্টা দেরিতে সেটি ছাড়লেও বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ট্রেনটি আটকে ছিল বঙ্গবন্ধু সেতুর আগে।

কারণ দুপুর দেড়টায় ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন এক্সপ্রেসের একটি বগি বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর রেলপথ থেকে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের বগি উদ্ধার হলে বিকেল সাড়ে ৪টার পর থেকে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ট্রেন চলাচল ফের শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া একের পর এক ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতু, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে।

ঢাকা-রংপুর রুটের রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। সেটি ছাড়ে সাত ঘণ্টা দেরিতে বিকেল ৪টায়। বিকেল ৫টা ৪৬ মিনিটে সেটি বঙ্গবন্ধু সেতুর বহু আগে মৌচাক এলাকা অতিক্রম করছিল। তখন পর্যন্ত ট্রেনটির বিলম্ব ছিল সাত ঘণ্টা ৩৮ মিনিট।

কমলাপুর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে সিল্কসিটি ট্রেনটি ছাড়ে ছয় ঘণ্টা দেরিতে। ট্রেন চলাচলে এমন দীর্ঘ বিলম্বে কমলাপুর রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড় উপচে পড়ছিল।

ট্রেনের ছাদে ভ্রমণে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিল রেলওয়ে। এর পরও গতকাল সকাল থেকে রেল কর্মকর্তা, এমনকি রেলমন্ত্রীর সামনেই ট্রেনের ছাদে কেউ শুয়ে, কেউ বসে যাত্রার অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। সকাল ১১টায় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন কমলাপুরে গেলে প্ল্যাটফর্মে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে প্রস্তুতিরত একতা ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীদের হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ট্রেনের ছাদে ভিড়ের মধ্যে কোনো রকমে বসে থাকা আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘টিকিট পাইনি। ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না।’ আর রেলমন্ত্রী বললেন, ‘ছাদে যাওয়া বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।’ তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে সমস্যা সমাধানের পথ জানতে চান।

গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তিনটি বিশেষ ট্রেনসহ ৫৫টি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা। বিকেল ৫টার মধ্যে ৩৮টি ট্রেনের মধ্যে ছেড়ে যায় ২৮টি ট্রেন। কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনুল হক গতকাল বিকেলে জানান, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটির বগি কী কারণে রেলপথ থেকে পড়ে গেছে তা তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। বন্যার ফলে বিধ্বস্ত রেলপথে ট্রেন ধীরে চালাতে হচ্ছে। এ ছাড়া একেকটি রেলস্টেশনে আগের চেয়ে বেশি বিরতি দিতে হচ্ছে বলে ট্রেন চলাচলে বিশেষ করে উত্তরের ট্রেনগুলোর সময়সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না।

কমলাপুর থেকে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ে। চিলাহাটিগামী নীলসাগর ছাড়ে চার ঘণ্টা দেরিতে।

রাজশাহীগামী বিরতিহীন বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী নিয়াজ রহমান বলেন, ‘দুপুর সোয়া ১টার ট্রেন কখন যাবে জানি না। এই ভিড়ের মধ্যে গরমে তিন মেয়েকে নিয়ে বিপদে আছি।’

মহাসড়কে চাপ : রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনালে গতকাল সকাল থেকেই ছিল প্রচণ্ড ভিড়। টিকিট না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠে ছুটেছে অনেকে। তবে বাস ঢাকা ছেড়ে মহাসড়কে উঠতেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেগে গেছে চার-পাঁচ ঘণ্টা। সায়েদাবাদে হানিফ পরিবহনের যাত্রী নয়ন রহমান সকাল ১০টায় বলেন, ‘৭টার বাস এখনো মহাসড়কে উঠতে পারেনি। চট্টগ্রাম যাব কখন?’ দেখা গেল, যাত্রাবাড়ী, চৌরাস্তা, গোলাপবাগ ও সায়েদাবাদে বাসের জট অদ্ভুত এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার রাত থেকেই মহাসড়কগুলোয় চাপ বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধু সেতুর সিরাজগঞ্জ অংশে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে গতকাল সকাল ১১টা ৪৮ মিনিট থেকে কিছু সময়ের জন্য টোল আদায় বন্ধ করে দেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। ওই সময় সেতুর পূর্বপাড়ে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

টার্মিনালে বাসের ছাদ বিক্রি : গতকাল সকালে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে ছিল যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। শেষ পর্যায়ে টিকিট কিনতে গেলে যাত্রীরা বিভিন্ন বাস কাউন্টার বন্ধ দেখতে পায়। তারা ছাদে উঠে যেতে বাসের ছাদের জায়গা কিনছিল। এ অবস্থা দেখা গেছে মহাখালী বাস টার্মিনালেও। পরিস্থিতি দেখতে গতকাল সকালে গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবার ঈদ যাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে ফেরিঘাটে। নদীতে প্রবল স্রোতে ফেরি মাঝে মাঝে বন্ধ থাকে। আমরা আশা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে আমরা কঠোরভাবে তদারকি করছি। রংপুরগামী একটি বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল বলে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

গাবতলী বাস টার্মিনালে ফরিদপুর, পটুয়াখালী, বরিশাল, মাগুরা যাওয়ার জন্য যাত্রীপ্রতি বাসের ছাদে ৫০০-৬০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনালে প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে টিকিট কাউন্টারে গেলে টিকিট না পেয়ে বেলা আড়াইটায় এসআই এন্টারপ্রাইজের বাসের ছাদে ওঠেন আমিন আলী। তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ যেতে ছাদে বসে গেলে ১০০ দিলেই হবে। কাউন্টার বন্ধ রেখে ছাদে যাওয়ার টিকিট ৯০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রী আলী আশরাফ।

সদরঘাটে যাত্রীর ঢল : গতকাল সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঢল নামে ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের। বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, বরগুনা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায় যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো ছেড়ে যায়। সদরঘাটে লঞ্চ টার্মিনালে যাওয়ার আগে সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ যানবাহন আটকে দেয়। ফলে যাত্রীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে হেঁটে সদরঘাট টার্মিনাল পৌঁছায়।

 

মন্তব্য