kalerkantho

ঈদ যাত্রায় বিঘ্নের শঙ্কা

► মহাসড়কে ইট-বালুর ঠুনকো সংস্কারও শেষ হয়নি
► পশুবাহী ট্রাকে বিশৃঙ্খল ঢাকার সব প্রবেশপথ

পার্থ সারথি দাস   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈদ যাত্রায় বিঘ্নের শঙ্কা

মহাসড়কের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়া এবং পশুবাহী ট্রাকের বিশৃঙ্খল চলাচলের কারণে বিভিন্ন মহাসড়ক ও রাজধানীর সড়কগুলোর স্থানে স্থানে তীব্র যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৮টি হাটে পশু আনার পর্ব চলছে। বেশির ভাগ হাটে নির্ধারিত সময়ের আগেই শুরু হয়েছে বেচাকেনা। গত শুক্রবার থেকে পুরোদমে বাণিজ্য জমতে শুরু করলে যানজট ও বিশৃঙ্খলার মাত্রা বেড়ে যাবে বলে ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। তবে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একের পর এক সভা, নির্দেশনা দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সভা করেছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ের অভাবে এসব নির্দেশনার পুরো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।  

রাতে শুধু নয়, দিনের বেলায়ও রাজশাহী, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে পশুবাহী ট্রাক ঢোকানো হচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পশুবাহী ট্রাক ঢোকায় অন্যতম প্রবেশপথ আব্দুল্লাহপুর-মহাখালী ও কুড়িল-প্রগতি সরণিতে গাড়ির জট পাকিয়েছিল স্থানে স্থানে। বিকেলে নর্দা পদাচারী সেতুর নিচে, কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে যানজট চোখে পড়ে। নর্দা পদাচারী সেতুর পর থেকে কুড়িলমুখী পথে সারি সারি গাড়ি ধীরে চলছিল। দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মো. আনোয়ারের কাছে যানজটের কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘উন্নয়নকাজের জন্য সামনের সড়কের অংশ বন্ধ। পশুবাহী ট্রাকও বেড়েছে। কোনো মোড়ে ট্রাক ঘোরালে অন্যান্য যানবাহনকে তার পেছনে অপেক্ষা করতে হয়। আর তাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।’

রাজশাহী থেকে ১৫টি গরু নিয়ে ভাটারার সাঈদনগরের পশুহাটের দিকে ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছিলেন সবুর মিয়া। নতুনবাজারে যানজটে স্থির হয়ে গেল চাকা। বললেন, ‘ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে খিলক্ষেত আসতেই এক ঘণ্টা লেগেছে। খিলক্ষেত থেকে কুড়িল, নর্দায় আটকে থাকতে হয়েছে। নতুনবাজারের জটে পড়ে আছি। সাঈদনগর পশুহাটটি নতুনবাজারের কাছেই। বিকেলে সেখানে পশুবাহী গাড়ির সঙ্গে অন্যান্য গাড়ির চাপ মিলে তৈরি হয় ধীরগতি।’

গাবতলী পশুর হাট গাবতলী-আমিনবাজার প্রধান সড়কের কাছেই। গতকাল সকাল থেকে এই হাটেও ঢুকছিল পশুবাহী ট্রাক। এভাবে শনির আখড়া, দনিয়া মাঠ সংলগ্ন পশুহাটে, খিলগাঁও রেলগেট বাজারের কাছে মাঠে এবং কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন খালি জায়গার মতো পশুর হাটে ট্রাকগুলোকে যেতে হচ্ছে প্রধান সড়ক হয়েই। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, গাবতলীতে তাই যানজট গতকালও ছিল।

আজ বৃহস্পতিবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেশির ভাগই কর্মস্থলে যোগ দিয়ে বা কাজ শেষ করে বিকেলে বাড়ির পথে রওনা হবে। আগামীকাল শুক্রবার ও তার পরদিন শনিবার সরকারি ছুটি। ঈদের মূল ছুটি রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত। পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আজ বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, সদরঘাট ও বিমানবন্দরে যেতে যাত্রীদের স্থানে স্থানে যানজটে পড়তে হবে। তবে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ দাবি করছে, যানজট বাড়বে না। গতকাল ট্রেনে আগাম টিকিটে বাড়ি ফিরতে প্রথম দিনের ট্রেনের সময়সূচি বিড়ম্বনায় পড়ে যাত্রীরা। গতকাল লালবাগ থেকে প্রগতি সরণির নর্দায় এসে আটকে পড়েছিলেন উবারের মোটরসাইকেলচালক মো. তারিকুল রানা। তিনি বলেন, লালবাগে পশুর হাটে সকাল থেকেই ট্রাকে আনা গরু-ছাগল নামানো হচ্ছিল। লালবাগ কেল্লার অদূরে মোড় ঘুরিয়ে ট্রাক চলাচল করছিল বলে যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর মালিবাগ, কাকরাইলেও পশুর ট্রাকের পেছনে চলতে হয়েছে।

সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজকের মধ্যে নাজুক সব মহাসড়কের অংশ সংস্কার করার কথা রয়েছে। তবে কাজের যে ধীরগতি চলছে, তাতে সব সংস্কারকাজ শেষ হবে না বলে সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই মনে করছেন। কারণ স্থায়ী সংস্কার কাজ না করে ইট-বালু ফেলে কোথাও কোথাও সংস্কার করা হচ্ছে। এতে এই অংশগুলো বৃষ্টির পানিতেই ভেসে যাবে বলে মনে করছে চালকরা।

চলছে ইট-বালুর ঠুনকো সংস্কার : এবার বন্যায় সওজ অধিদপ্তরের ৮০১ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার ১৮৫ কিলোমিটার। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে জেলার নলকা সেতু সংস্কার কাজ শেষ হয়নি। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত সৃষ্ট সব গর্ত ভরাট করা হয়নি। ঘুরাকা থেকে রয়াহাট পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও নাজুক। জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাটিকুমরুল-বনপাড়া জাতীয় মহাসড়কের মহিষকুটি ও মান্নাননগরে ইট বিছানোর কাজ চলছে। রাতে শেষ হবে। হাটিকুমরুল-চান্দাইকোনা মহাসড়কের ১৮ কিলোমিটারে সংস্কারকাজ করছি। দুই দিন ধরে রাস্তায় আছি। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ১৫ কিলোমিটারের পর প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার অংশ সংস্কার করা হলেও নলকা ও ধোপাকান্দি সেতু সরু হওয়ায় গাড়ির গতি কমেছে, যানজট হচ্ছে না।’ ময়মনসিংহ সড়ক জোনের বিভিন্ন জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার হয়েছে বলে জানান ময়মনসিংহ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুল আলম। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে গত মঙ্গলবার থেকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য। আগের রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. লিয়াকত আলী বলেন, রংপুর-বগুড়া মহাসড়কের মোকামতলার পর সংস্কারকাজ শেষ হয়নি। তবে রংপুর সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার মহাসড়ক জরুরি মেরামত করা হয়েছে। বিটুমিনের কাজ বর্ষা না গেলে করা যাবে না। রংপুর-বগুড়া মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করতে পারছে।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ২৫টি স্থানের পরিস্থিতি : মহাসড়কে ঈদ যাত্রার পরিস্থিতি তদারক করতে গত মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর বিআরটিএ ভবনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন মহাসড়কের ২৫টি স্থানে বসানো ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করা চিত্র এখান থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় এ কক্ষে দায়িত্বরত সওজের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক। মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা, বঙ্গবন্ধু সেতু, এলেঙ্গা, কোনাবাড়ী, বাইপাইল—এসব ব্যস্ত মোড়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হিমাচল পরিবহন আগে ঢাকার টিটিপাড়া থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত ভাড়া নিত ৩০০ টাকা। ঈদের কারণে ১০০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগটি যাত্রী আল মামুন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানালে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিষয়টি বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে জানালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল ইসলাম সেখানে যান।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঈদ যাত্রা আগের বছরগুলোর চেয়ে এবার নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।

 

মন্তব্য