kalerkantho

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতি করে ভর্তি

ঢাবির ৬৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢাবির ৬৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলিম। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ভর্তি কোচিং করতে এসে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর, যিনি নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেন। পরে ওই ব্যক্তির ফাঁদে পা দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে জালিয়াতচক্রের সহায়তায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যায় এ জালিয়াতি। ধরা পড়া জালিয়াতচক্রের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে সেলিমের নামও পেয়ে যায় পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সব শেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে।

শুধু সেলিমই নন, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৬৯ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাঁরা সবাই ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ছয় বছরে ভর্তি হয়েছিলেন।

গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিষদের বৈঠকে এই ৬৯ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। তাঁদের সবাইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, এই তালিকায় আরো তিনজন শিক্ষার্থী থাকলেও নাম-ঠিকানার সঙ্গে অমিল পাওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। তবে পরিচয় শনাক্ত হলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযোগপত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তদন্তের ভিত্তিতে এসব শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে তাঁদের এক সপ্তাহের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হবে।

উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সভায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও হল প্রাধ্যক্ষরা।

জালিয়াতির অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারিতে আরো ১৫ শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে মোট ৮৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বহিষ্কারের এ তালিকাই শেষ নয়, আরো কিছু শিক্ষার্থীর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সব তথ্য-উপাত্ত পেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন। গত ছয় বছরে শতাধিক শিক্ষার্থী জালিয়াতচক্রের ফাঁদে পা দিয়ে অসদুপায় অবলম্বন করে ভর্তি হয়েছে। নিজের মেধা ব্যবহার না করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হতে প্রত্যেককে দিতে হয়েছে ৫-১০ লাখ টাকা।

বহিষ্কারের তালিকায় থাকা আরো পাঁচজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠ’র। পরিচিতজন, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের কাছে হেয় হবেন—এমন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাঁরা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। এ শিক্ষার্থীরা জানান, চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে যখন অপরাধে জড়িয়েছেন তখন বুঝতে পারেননি যে এত কিছু হবে। এখন বুঝতে পারলেও আর কিছু করার নেই। টাকাও খোয়াতে হলো আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল। তাঁরা জানান, জালিয়াতচক্রের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মূল সার্টিফিকেট বন্ধক রেখে ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। পরীক্ষার আগে আংশিক টাকা অগ্রিম দিতে হয়েছে। ফল প্রকাশের পর দিতে হয়েছে বাকিটা। ডিজিটাল ডিভাইস কানে পুরে দিয়ে পরীক্ষা দিতে যান তাঁরা। প্রশ্নপত্রের সেট কোড বলার পর অন্য পাশ থেকে উত্তর বলে দিয়ে ভর্তি হতে সাহায্য করেছে ওই চক্র। কারো কাছ থেকে পাঁচ লাখ, কারো কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছে চক্রটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের গ্রামের বাড়ি, হল কার্যালয় ও নিজ নিজ বিভাগে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে চিঠি পাঠানো হবে। তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিতে সময় দেওয়া হয়েছে। কেউ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিষয় বিবেচনা করবে প্রশাসন।

২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চলতি বছরের ২৩ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শিক্ষার্থীসহ ১২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং পাবলিক পরীক্ষা আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় ২৬ জুন ৭৭ জনের বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মো. সারাফুজ্জামান আনসারী। যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা গেল কি না, তা ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে আদালতকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

 

মন্তব্য