kalerkantho

স্লিপারে নাটের বদলে বাঁশ, ট্রেন এলে কাঁপে

টঙ্গীর দুই রেল সেতু

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্লিপারে নাটের বদলে বাঁশ, ট্রেন এলে কাঁপে

ডগস্পাইয়ের (লোহার পিন) পরিবর্তে অনেক স্লিপারের সঙ্গে রেল আটকানো হয়েছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে। সরে যায় বলে স্লিপার বাঁধা হয়েছে লোহার তার দিয়ে। বেশির ভাগ স্লিপার পচে গেছে। মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে বেশির ভাগ ডগস্পাই। ট্রেন এলে নড়বড় করে স্লিপার। থরথর করে কাঁপে রেল, ফিশপ্লেট ও নাট-বল্টু। এমন বেহাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তুরাগ নদের ওপর টঙ্গীর দুই রেল সেতুর।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বহীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেতু দুটি। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জরাজীর্ণ রেল সেতু ভেঙে ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচ যাত্রীর মৃত্যুর পর আলোচনায় আসে রেলপথ ও সেতুর দুরবস্থার চিত্র। রাজধানী ঢাকার কাছে পুরো দেশের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগের অন্যতম এই দুই সেতুর এমন বেহালে আতঙ্কিত স্থানীয় লোকজন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তুরাগ নদের ওপর রেলওয়ের দুটি সেতুই জরাজীর্ণ। লোহার পিন ও ফিশপ্লেটে মরিচা ধরে ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। পচে ঝুরঝুর করছে অনেক স্লিপার। বহু স্লিপারে ডগস্পাই নেই। অনেক স্লিপারে ডগস্পাইয়ের পরিবর্তে রেল আটকানো হয়েছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে। সেগুলোও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। ডগস্পাই যেগুলো আছে, বেশির ভাগের মাথা মরিচায় ক্ষয় হতে হতে নেই বললেই চলে। নড়বড়ে স্লিপার বেঁধে রাখা হয়েছে লোহার তার দিয়ে। ট্রেন সেতুর ওপর উঠলে ওঠানামা করে রেল। থরথর করে কাঁপে স্লিপার, ফিশপ্লেট, নাট-বল্টু।

স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, রেলের কর্মকর্তাদের রেলপথ ও সেতুর দিকে নজর নেই। সেতু দুটির দুরবস্থা দেখলে বোঝাই যায় দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। লোহার পিনের পরিবর্তে বাঁশের খুঁটি লাগিয়ে সেতু ও রেলপথ যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। শুধু সেতু নয়, রেললাইনের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। অনেক স্লিপারে ডগস্পাই নেই। থাকলেও লুজ। অনেক স্থানে বৃষ্টিতে মাটি দেবে গেছে। সরে গেছে পাথর। এসব কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রেলপথ।

এই সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে আন্ত নগর, মেইল, লোকাল, বিশেষসহ শতাধিক ট্রেন আপ-ডাউন করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন যাতায়াত করে হাজার হাজার যাত্রী। ট্রেনগুলো অনেক ভারী। ফলে চলাচলের সময় প্রায়ই ডগস্পাই ঢিলে বা খুলে যায়। স্লিপার সরে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই প্রতিদিনই রেললাইন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর মাসে একবার, সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীর কমপক্ষে মাসে চারবার এবং ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, রেল খালাসি ও মিস্ত্রিদের প্রতিদিন রেলপথ পরিদর্শনের কথা।

টঙ্গীর জংশন স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার মো. হালিম জানান, তুরাগ সেতু জরাজীর্ণ, বিষয়টি ঠিক না। লোহায় মরিচা ধরতেই পারে। রেল কর্মকর্তারা নিয়মিত দেখাশোনা করেন। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

টঙ্গী এলাকার রেলওয়ের গ্যাং মিস্ত্রি আবদুল কাদির জানান, তুরাগ  সেতুতে কোনো সমস্যা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের নিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। গত মাসে ডাউন সেতুতে ১০০ ডগস্পাই লাগানো হয়েছে। তবে কিছু স্লিপার পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ১০-১১ বছর আগে ব্রড গেজে উন্নীত করার সময় এসব স্লিপার লাগানো হয়েছিল। পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া স্লিপার বদলানোর জন্য ঢাকার অফিসকে বলা হয়েছে।

রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই রেললাইন পরিদর্শন ও মেরামত করছি। টঙ্গী সেতুতে ডগস্পাইয়ের পরিবর্তে বাঁশের খুঁটি দিয়ে স্লিপার আটকানোর অভিযোগ সঠিক নয়। সেতুও ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ওই দুই সেতুর কিছু স্লিপার নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রুত নষ্ট স্লিপার পরিবর্তন করা হবে।’

সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মো. ইফতেখার হোসাইন জানান, তুরাগ রেল সেতুতে ডগস্পাইয়ের পরিবর্তে বাঁশের খুঁটি থাকার বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

 

ক্যাপশন : গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ রেল সেতুতে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আটকানো রেল। ছবিগুলো গত সোমবার তোলা।

 

মন্তব্য