kalerkantho

পাস্তুরিত দুধ

বিক্রিও বাড়ছে উদ্বেগও আছে

শওকত আলী   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিক্রিও বাড়ছে উদ্বেগও আছে

পাস্তুরিত দুধ বিক্রিতে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার পরও মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই অনেক ক্রেতা আবার পাস্তুরিত দুধ কিনতে শুরু করেছে। তবে বিক্রি এখনো স্বাভাবিক হয়নি বলে জানা গেছে।

রাজধানীর পাস্তুরিত দুধ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ মনে করছেন, ক্ষতিকর কিছু নেই বলেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সত্যিকার অর্থে ক্ষতিকর কিছু পাওয়া গেলে  কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বড় ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়ার যে ঘটনা, এতে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তাঁরা বলছেন, সরকারের একেক সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করেছে।

মিরপুর ১১ নম্বরের বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আরেফিন রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখন আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন তখন আমি কেনা বন্ধ করি। আবার যখন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হলো তখন আবার দুধ কেনা শুরু করি। কিন্তু এই যে অ্যান্টিবায়োটিক আর সিসার ভয় ঢুকে গেছে মনে, সেটা কাটেনি।’

পান্থপথের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম রিপন বলেন, ‘সরকারের একেক সংস্থা একেক রকম কথা বলছে। কেউ বলছে সিসা আছে, কেউ বলছে নেই। তাহলে আমরা কই যাব, আর কোন কথাটাই বা বিশ্বাস করব! এখন কান বন্ধ করে খাওয়া শুরু করেছি। কারণ আমার পুষ্টির চাহিদা তো পূরণ করতে হবে।’

রামপুরায় একটি সুপার শপে দুধ কিনতে আসা ক্রেতা রাবেয়া সুলতানা স্মৃতি জানালেন, তিনি পাস্তুরিত দুধ কেনা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ‘ইউএসটি মিল্ক’ কেনা শুরু করেছেন। কারণ তিনি বাচ্চাদের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষা করে তার মধ্যে ডিটারজেন্ট ও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার কথা জানান। সেই থেকে আলোচনার সূত্রপাত। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর আদালত দুধ পরীক্ষার নির্দেশ দেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে (বিএফএসএ)। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তাদের পরীক্ষায় সিসা পাওয়ার কথা জানায়। এর ওপর ভিত্তি করে আদালত বৈধ ১৪টি কম্পানিকে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন ও বিপণনে পাঁচ সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেন। যদিও দ্রুত আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত থেকে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পেয়ে দুধ উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু করে কম্পানিগুলো। সর্বশেষ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক পরীক্ষার তথ্য জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের গবেষণা ও বিএফএসএর তথ্যে ক্ষতিকর উপাদানের কথা উঠে এলেও কৃষি গবেষণা কাউন্সিল কোনো ক্ষতিকর উপাদান পায়নি। এখানেই ক্রেতারা আরো বেশি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।

মাসখানেক ধরে চলমান বিতর্কে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোর বিক্রি কমে যায়। বাজারে দুধ বিক্রি কমে যাওয়ায় কম্পানিগুলো খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনা কমিয়ে দেয়। খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানায়। তবে এ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বর্তমানে। সংকটকালে কম্পানিগুলোর বিক্রি ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর আবার বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে।

দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্ক ভিটা) চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর থেকে দুধের চাহিদা বাড়ছে। যেটুকু বিক্রি কমেছিল সেখান থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি বেড়েছে। তবে পুরো স্বাভাবিক হতে আরো একটু সময় লাগবে। যেহেতু অনেক মানুষই এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।’

আকিজ ডেইরি অপারেশনসের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক ছিল তা এখনো কাটেনি। এটা কাটতে সময় লাগবে। এ কারণে আমরা স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ দুধ উৎপাদন করতাম তা করতে পারছি না। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর যেটুকু বিক্রি বেড়েছে সেটা খুবই সমান্য; ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বলা যায়।’

খুচরা বিক্রেতারাও জানিয়েছে, পাস্তুরিত দুধ বিক্রি বেড়েছে। তারা জানায়, এখন সব কম্পানির দুধ পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রিও বেড়েছে; যদিও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা কম।

রামপুরা ওয়াপদা রোডের আব্দুর রাজ্জাক স্টোরের বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর থেকে বিক্রি বাড়ছে। তবে আগে প্রতিদিন ১২-১৫ লিটার দুধ বিক্রি হতো। এখন হচ্ছে ৮-৯ লিটার।’

মন্তব্য