kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘ফুটওয়্যার : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক

দক্ষতার অভাবে ব্যাহত পাদুকাশিল্পের বিকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দক্ষতার অভাবে ব্যাহত পাদুকাশিল্পের বিকাশ

কালের কণ্ঠ-ওরিয়ন ফুটওয়্যার লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে গতকাল ইডাব্লিউএমজিএল মিলনায়তনে ‘ফুটওয়্যার : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

যথেষ্ট নীতি সহায়তা থাকার পরও যথাযথ অবকাঠামোগত সুবিধা এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশি পাদুকাশিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ হচ্ছে না। সাভার ট্যানারিপল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরো মাত্রায় কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশগত প্রশ্নে বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য। এ অবস্থায় ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গতকাল রবিবার ‘পাদুকাশিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের (ইডাব্লিউএমজিএল) সম্মেলনকক্ষে কালের কণ্ঠ ও ওরিয়ন ফুটওয়্যার যৌথভাবে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় এতে আলোচক হিসেবে ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল হালিম, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বাণিজ্য সংগঠন অধিদপ্তরের পরিচালক ওবায়দুল আজিম।

এতে স্বাগত বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল। ওরিয়ন ফুটওয়্যার লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন মোল্লা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, শ্রমঘন শিল্প হিসেবে পাদুকাশিল্পে বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল চামড়া স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় চামড়াকে বিশ্বের সেরা মানের চামড়া বলা হয়ে থাকে। এ ছাড়া তুলনামূলক কম মজুরি দিয়ে পর্যাপ্ত শ্রমিকও মিলছে। এগুলো এ শিল্পের জন্য আশীর্বাদ।

বক্তারা বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা, ট্যাক্স হলিডে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি ও ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় দেশের পাদুকাশিল্প।

তবে এত সুবিধার পরও বিকাশমান এই শিল্পের বাধাও কম নয়। বিশেষ দক্ষ জনশক্তির অভাব, সংযোগ শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানি, প্রযুক্তিগত সমস্যা, উদ্ভাবনী সক্ষমতার দুর্বলতা, বন্দর ও কাস্টমের আইনি জটিলতা এবং ব্যবসার খরচ ও লিড টাইম (পণ্য জাহাজীকরণের সময়) ্বেশি নেওয়ার কারণে এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

আলোচকরা বলেন, এত কিছুর পরও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে আগামী ১০ বছরে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের পরিপূরক হতে পারে পাদুকাশিল্প। এ জন্য সরকারিভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে। ক্রেতাদের নকশা থেকে বের হয়ে নিজেদের নকশায় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে হবে। এ জন্য দেশে বিশ্বমানের ডিজাইন স্টুডিও করতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, পাদুকাশিল্পে তিন হাজারের বেশি কারখানা উৎপাদনে থাকলেও ৪০টির বেশি বিশ্বমানের কারখানা রয়েছে দেশে। বাংলাদেশ প্রতিবছর ৪২ কোটি ৮০ লাখ জোড়া পাদুকা রপ্তানি করে প্রায় শতকোটি ডলার আয় করে। এ ছাড়া এ খাতের জন্য স্থানীয় বাজারও প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ৩০ কোটি ৭০ লাখ জোড়া জুতা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শিল্পসচিব মো. আবদুল হালিম বলেন, পাদুকাশিল্পের নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এ নীতিমালা প্রস্তুত করা হলে পাদুকাশিল্পের বেশির ভাগ সমস্যা দূর হয়ে যাবে। সাভার শিল্পনগরীর সিইটিপির সমস্যার অতি দ্রুত সমাধান হবে।

পবন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য চামড়াশিল্পের এখন সবচেয়ে সুবর্ণ সময়।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, বিদ্যমান সমস্যা ও সংকট সমাধান করে পাদুকাশিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে সরকারের নীতি সহায়তার পাশাপাশি খাতসংশ্লিষ্ট সবাইকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে।

কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘পাদুকাশিল্প পোশাকশিল্পের মতো গুরুত্ব পায়নি। এ খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। আমরা চাই সরকার এই খাতে বিশেষ নজর দিক।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ওবায়দুল আজম বলেন, দেশের পাদুকাশিল্পের জন্য ২০২১ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু তা অর্জন মোটেই সম্ভব নয়। এর অনেক কারণ আছে। তবে অন্যতম কারণ সাভারের ট্যানারি পল্লীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার। এটি  এখনো কাজ করছে না। ফলে পরিবেশের দোহাই দিয়ে আমদানিকারকরা এ দেশের পাদুকাশিল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে বিদেশ থেকে চামড়া এনে জুতা তৈরি করে রপ্তানি আদেশ পরিপূর্ণ করতে হয়। বাংলাদেশের পাদুকাশিল্প বিশ্বমানে পৌঁছাতে না পারার এটি একটি বড় কারণ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে দেশের পাদুকাশিল্পকে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে বেশি দিন আমাদের পাদুকাশিল্প টিকে থাকতে পারবে না।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর না হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও কোনো সুফল পাইনি। গত দুটি  বছর আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আশা করছি আগামী ছয়-সাত মাসের মধ্যে আশার আলো দেখব।’

বাংলাদেশ স্পোর্টস সু’স ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সদস্য রিয়াদ মাহমুদ বলেন, জুতা খাতে চীনের বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ব্যবসা হচ্ছে না। বন্ড সুবিধা নিয়ে যথেচ্ছাচার, বন্দরের সমস্যার কারণে জুতা খাতের ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

বন্দরে বিভিন্ন অজুহাতে কাঁচামাল আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করার অভিযোগ করে জেনিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা দিলে ছাড় মেলে। অথচ আমরা বৈধভাবে কাজ করতে চাই।’

বন্ড খাতে কিছু সমস্যা থাকার কথা স্বীকার করেন ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার মো. মেহেবুব হক। তিনি বলেন, সরকার বন্ড খাতে অটোমেশন বাস্তবায়নে জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সম্ভাবনাময় এ খাতকে এগিয়ে নিতে দক্ষ জনবল তৈরিতে জোর দেন ওয়াকার ফুটওয়্যার লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার কামরুল হাসান। তিনি বলেন, কাঁচামাল ও পাদুকাশিল্পের প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ টাকা দিয়ে কিনে আনতে পারব, কিন্তু দক্ষ জনবল ছাড়া প্রতিষ্ঠান চালানো যাবে না। দক্ষ জনবল তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

পাদুকাশিল্পের উন্নয়নে পরিবেশগত উন্নয়ন ও সিইটিপি উন্নয়নে জোর দেন ফারস্কিন লেদারটেকের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইজাবুল হক। তিনি বলেন, পরিবেশের কারণে বাংলাদেশের পাদুকাশিল্প বিদেশি ক্রেতা হারাচ্ছে।

এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান, এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের এজিএম (মার্কেটিং) জোয়েব আহমেদ, এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শাহিন আনোয়ার, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) মোতাহার হোসেন ও বাংলাদেশ পাদুকা প্রস্তুত সমিতির দপ্তর সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা