kalerkantho

‘কুঁড়েঘর’-এর মোজাফফর আহমদ

যেমন আছেন তিনি

কাজী হাফিজ   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যেমন আছেন তিনি

কুঁড়েঘর প্রতীকের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম কুশীলব। এ দেশের রাজনীতি অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন এবং জীবিত কিংবদন্তি। প্রায় আট দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই মানুষটি ইতিহাসের ‘নায়ক’ হতে না পারলেও গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কারো বা মূল্যায়ন, তিনি চলমান ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনিই বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ। এরই মধ্যে ৯৮তম জন্মদিন পার করেছেন। জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ করতে অপেক্ষা আর দুই বছর। তাঁর জ্যেষ্ঠতা শুধু বয়সের বিচারেই নয়, রাজনীতিতে নিষ্ঠার বিচারেও। নিজের জীবদ্দশাতেই এমন সব মূল্যায়ন পাচ্ছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের কাছে। ২০১৫ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে তিনি সবিনয়ে তা গ্রহণে অপারগতা জানান।

নির্লোভ ও নিষ্ঠার প্রতীক এই রাজনীতিক বর্তমানে কেমন আছেন—এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গত ২৭ জুলাই কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে তাঁর জীবনসঙ্গী সাবেক সংসদ সদস্য আমিনা আহমদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘চার-পাঁচ দিন ধরে উনি কথা বলতে পারছেন। বেশ ভালোভাবে কথা বলছেন। দেখা করতে চাইলে আসতে পারেন।’ কবে, কখন গেলে আপনাদের অসুবিধা হবে না—এ প্রশ্নে বললেন, ‘শুক্রবার বিকেল ৫টায় আসতে পারেন।’

নির্ধারিত সময়ে রাজধানীর বারিধারার বাসায় পৌঁছে আমিনা আহমদের সঙ্গে তাঁদের জীবনযাপন, বর্তমান রাজনীতি নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপের পর মোজাফফর আহমদের কক্ষে যাই। কক্ষটি যেন হাসপাতালের কেবিন। তাঁকে দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্রাদাররা। পালা করে দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। মুখ দিয়ে খাবার খেতে পারেন না। বিশেষ ব্যবস্থায় পাকস্থলীতে তরল খাবার দেওয়া হয়।

কেমন আছেন—এ প্রশ্নে প্রথমে সাড়া দিলেন না। প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে বালিশ থেকে মাথা তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছু বলতে চাইলেন। পরে হাল ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। আমিনা আহমদ বললেন, ‘কথা বলতে আজ আবার দেখছি সমস্যা হচ্ছে। গত চার-পাঁচ দিন ভালোভাবেই কথা বলেছেন। ২৭ জুলাই আমাদের দলের ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এটা কোন মাস, তা আমার কাছে জানতে চাইলেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কথাও বললেন। জানতে চেয়েছেন সাইদুজ্জামান (এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান), মোনায়েম সরকার (আওয়ামী লীগ নেতা)—এঁরা এসেছিলেন  কি না। হাসপাতালের ব্রাদারদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। চোখেও তেমন সমস্যা নেই। চশমা চেয়ে নিয়েছিলেন। তবে জুন মাসে খুবই অসুস্থ ছিলেন। অ্যাপোলো হাসপাতালে তাঁকে লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়েছিল। ১১ দিন পর সুস্থ হলে বাসায় আনা হয়।’ 

আমিনা আহমদ নিজেও বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুব্জ। হাঁটতে-চলতে সমস্যা হয়। বর্তমানে দলের নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের চিন্তা-ভাবনা এবং তাঁর সম্পর্কে বিশিষ্টজনদের মূল্যায়ন জানতে কয়েকটি বই ও পত্রিকা দিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘জীবন্ত কিংবদন্তি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ’, তাঁর ৯৮তম জন্মদিন উপলক্ষে গত পহেলা বৈশাখ প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা নতুন বাংলার বিশেষ সংখ্যা ও ১৯৯১ সালে প্রকাশিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নিজের লেখা ‘কিছু কথা’।

কিছু কথায় তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার বন্ধু ছিলেন। অন্যান্য গুণাবলী ছাড়াও তার ছিল দু’টি বিশেষ গুণ—মানুষের সঙ্গে মেশা, মানুষকে বুঝা এবং সংগঠন করা। এই দুই ব্যাপারে তার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এই গুণগুলি আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিরল। বঙ্গবন্ধুর সাথে একই পার্টিতে, পরবর্তীতে একই রাজনীতিতে ছিলাম অনেক দিন। পরস্পরকে বুঝার মধ্যে কোন কমতি ছিল না। তিনি কখনও শোষকের পক্ষে ছিলেন না।’

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনিই প্রথম জাতীয় নেতা যাকে বাংলার আমজনতা তাদের আপন লোক ভাবতে পেরেছিলেন।’ মওলানা ভাসানী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এদেশের রাজনীতি বড় লোকের প্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসার ব্যাপারে শেরে বাংলা ফজলুল হকের চেয়ে মওলানা ভাসানীর অবদান কম নয়।’ শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন সংসদীয় গণতন্ত্রের সাধক হিসেবে। আর এ যুগের রাজনীতিবিদ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে পেটনীতি, ব্যবসা ও দুর্নীতির আড্ডাখানা। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা প্রায় সবাই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। দেশ স্বাধীন হয়েছে ২০ বছর (১৯৯১ সালের লেখা)। এত অল্প সময়ে এত সম্পদ কিছু লোকের হাতে এসেছে তা ভাবতে অবাক লাগে।’

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সস্ত্রীক বারিধারার যে বাসায় থাকেন সেটি তাঁদের একমাত্র মেয়ে আইভি আহমদ ও জামাতা সৈয়দ খালেদুজ্জামানের বাসা। আইভি আহমদ মস্কোতে চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে লেখাপড়া করেন।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার থানার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। মোজাফফর আহমদ হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন, দেবীদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পড়ালেখা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ইউনেসকোর ডিপ্লোমা লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্র দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি ও তাঁর স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯৫৪ সালে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবীদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করেন। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। তিনি আত্মগোপনে থেকে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন আবার। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন। তিনি আইয়ুব খান আহৃত রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন তিনি। এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিসি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ১৯৭৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে কারারুদ্ধ হন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা