kalerkantho

দেড় যুগ পর স্বীকৃতি মিলল স্ত্রী-সন্তানের

এম বদি-উজ-জামান   

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দেড় যুগ পর স্বীকৃতি মিলল স্ত্রী-সন্তানের

‘ভালোবাসা কারে কয়’, ‘ভালোবাসা মানে না কোনো বাধা’—এমন কত প্রবাদ রয়েছে। এমন কত ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্রও হয়েছে। কিন্তু এসবকে হার মানিয়েছে ঝিনাইদহের মালা ও মিলনের গল্প। জন্মের সাড়ে ১৮ বছর পর সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি মিলেছে মিলনের। সেই সঙ্গে সাড়ে ১৯ বছর পর মা মালা বেগমেরও স্বীকৃতি মিলল স্ত্রী হিসেবে।

কিন্তু এরই মধ্যে বাবা ইসলাম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। আর এর সমাপ্তি ঘটেছে বুধবার যশোর কারাগারে ইসলাম ও মালার ঘটা করে বিয়ের মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে ধর্ষণের মামলায় ১৯ বছর ধরে কারাবন্দি ইসলামের মুক্তির পথও সুগম হলো।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। এই আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে মালা ও ইসলামের পক্ষে বিনা টাকায় মামলা পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন আইনজীবী হিসেবে নিরীহ মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার যে কাজ তা পালন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। তার চেয়েও বড় কথা, একটি সন্তান ১৮ বছর পর স্বীকৃতি পেয়েছে। আর একজন নারী স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পেল। এই যে দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি একটি সুতোয় গাঁথা পড়ল, সেটাই ভালো লাগার জায়গা।’ তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনাবহুল মামলা হয়তো বাকি জীবনে নাও আসতে পারে।’

জানা যায়, ঝিনাইদহের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আজিজ মৃধার ছেলে ইসলামের সঙ্গে একই গ্রামের কাশেম আলীর মেয়ে মালা বেগমের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। দুই পরিবারের অজান্তে ২০০০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুজন স্থানীয় মৌলভির মাধ্যমে বিয়ে করেন। এরপর লোকচক্ষুর অন্তরালে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করতে থাকেন। এরই মধ্যে মালা বেগম গর্ভবতী হয়ে পড়েন। ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি জন্ম হয় মিলনের। এ অবস্থায় মালা বেগমের পরিবার ও স্থানীয় লোকজন বিয়ের জন্য চাপ দিলেও ইসলাম বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। সেই সঙ্গে মালার সন্তান তাঁর নয় বলে দাবি করেন। এ অবস্থায় মালার পরিবার আইনের আশ্রয় নেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা হয়। এই মামলা চলাকালে মিলনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। তাঁর ডিএনএ ইসলামের সঙ্গে মিলে যায়। এ মামলায় আদালত ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলেও হাইকোর্ট সাজা বহাল রাখেন। এরপর আপিল বিভাগে আপিল করেন ইসলাম। তাতেও লাভ হয়নি। তাঁর সাজা বহাল থাকে। এই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রিভিউ আবেদন করেন তিনি। এই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানির সময় আইনজীবীর মধ্যস্থতায় ইসলাম মালাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি হন। সেই সঙ্গে মিলনকে নিজের ছেলে হিসেবেও মেনে নেন।

এ অবস্থায় বুধবার যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ইসলামের সঙ্গে মালার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ও কাবিন রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে ছেলে মিলনও উপস্থিত ছিলেন।

পুরো ঘটনা গতকাল আপিল বিভাগের কাছে বর্ণনা করে ইসলামের জামিন ও মুক্তির জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগও আইনজীবীর শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে ইসলামের জামিন মঞ্জুর করে তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দেন। এ আদেশে আদালতকে আগামী ২৯ আগস্ট অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় মিলন, তাঁর মা, দাদা ও নানা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালতে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

মন্তব্য