kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

এক মাসের মাথায় ডেঙ্গু রোগী পাঁচ গুণ

► আক্রান্ত বেশি পুরুষ, কষ্ট বেশি শিশুদের হ চিকিৎসায় নানা জটিলতা
► হাসপাতালে ভিড় বাড়ছেই
► মৃত্যুর তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি কমছে না
► ২৩ দিনে আক্রান্ত হয়েছে সরকারি হিসাবেই ৫৬৩৭ জন

তৌফিক মারুফ   

২৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক মাসের মাথায় ডেঙ্গু রোগী পাঁচ গুণ

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা মশারি টাঙিয়ে শুয়ে আছে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার নবম শ্রেণির ছাত্রী সুপ্রভার বৃহস্পতিবারে হালকা জ্বর, সঙ্গে মাথা ব্যথা, শরীরে ব্যথা ছিল। শুরু থেকেই ভয় ছিল ডেঙ্গু হলো কি না! শুক্র-শনিবারও জ্বর কমেনি, বরং শরীরে লালচে র‌্যাশ দেখা যায়, শুরু হয় চুলকানি। রবিবার ডেঙ্গুর টেস্ট করাতেই রেজাল্ট পজিটিভ আসে। রাতে অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাকে দেখানো হয়। তাঁর পরামর্শ অনুসারে বাসায় রেখেই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শপত্রে পরিষ্কারভাবে একটি আইভি ইনজেকশন লেখা থাকলেও বাসার কাছের একটি ফার্মেসিতে গেলে ইনজেকশন পুশ করা হয় মাংসে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সুপ্রভার স্বজনরা।

টাইফয়েডে আক্রান্ত পাঁচ বছরের শিশু আযহাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তিন দিন চিকিৎসার পর হঠাৎ করেই তার শরীর কিছুটা কালচে হয়ে আসে, সঙ্গে কোথাও কোথাও দেখা দেয় র‌্যাশ। ডাক্তাররা ডেঙ্গুর পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। আযহার মা শাহিদা বেগম দিশেহারা হয়ে বলেন, ‘আসলাম টাইফয়েডের চিকিৎসা করাতে, আর হাসপাতালে এসে এখন ডেঙ্গুতে ধরছে মেয়েটিকে। আল্লায়ই জানে কী অবস্থা হয়!’

গত ২৩ জুন ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৮৮ জন আর গতকাল মঙ্গলবার এক মাসের মাথায় হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪৪৩ জন। অর্থাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে পাঁচ গুণ। মাঝের দিনগুলোয় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। এর মধ্যে গত তিন দিনে বেড়েছে খুবই দ্রুতগতিতে। রাজধানীর ৩৬টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতেই রোগীর সংখ্যা বেশি। চলতি মাসের গত ২৩ দিনে মোট আক্রান্ত হয়েছে সরকারি হিসাবেই পাঁচ হাজার ৬৩৭ জন আর চলতি বছরে এ সংখ্যা উঠেছে সাত হাজার ৭৬৬ জনে।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার

হাসপাতালে এখন ১১২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে, এর মধ্যে আজ (গতকাল) ভর্তি হয়েছে ৪৩ জন। আমরা এখানে আলাদা করে ডেঙ্গু কর্নার চালু করেছি, সেই সঙ্গে আউটডোরেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বুধবার এখানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি সভার আয়োজন করা হয়েছে যেখানে ডেঙ্গু চিকিৎসা ও সচেতনতার নানা দিক তুলে ধরা হবে।’

ওই হাসপাতালে টাইফয়েডের এক শিশুর শরীরে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেওয়া প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা হতে পারে টাইফয়েডের সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার অস্বাভাবিক নয়। আমরা এসব দিকেও খেয়াল রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব হাসপাতালেই ফরমেট পাঠিয়ে প্রতিদিন যোগাযোগ করে তথ্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু সবাই সমানভাবে রেসপন্স করে না। কেউ কেউ বলে তাদের হাসপাতালে রোগী সামাল দেওয়াই মুশকিল হয়ে যায়, তার মধ্যে তথ্য তৈরি করে পাঠানোর ঝামেলা তাঁরা করতে পারেন না।’

ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমরা সব রোগীর পরিচয়ও ঠিকমতো পাই না। এ পর্যন্ত গত ১ জানুয়ারি থেকে যে সাত হাজার ৭ রোগীর তথ্য এসেছে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে, তাদের মধ্যে মাত্র দুই হাজার ১৭৬ জন রোগীর নাম-ঠিকানা পেয়েছি। তা ভাগ করে দেখেছি আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৮৫৭ জন, নারী ৬৭৪ জন এবং শিশু ৬৪৫ জন। আর এ পর্যন্ত মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য আছে ছয়জনের।

এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এখানে যেসব স্যাম্পল আসে তার মধ্যে এমনও পাওয়া যাচ্ছে যে ঢাকার কোনো কোনো হাসপাতালে বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু পজেটিভ এসেছিল, কিন্তু আমাদের এখানে নেগেটিভ পেয়েছি। আর মৃতদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে। কোনো অবস্থাতেই কনফার্ম না হয়ে কাউকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে কী হয়নি বলা ঠিক নয়। আর নিশ্চিত না হয়ে এভাবে সংখ্যাও বলা ঠিক হচ্ছে না। এতে মানুষের মধ্যে সতর্কতার চেয়ে আতঙ্ক বেশি ছড়াতে পারে।’

ওই রোগতত্ত্ব বিজ্ঞানী বলেন, ‘ডেঙ্গু পরীক্ষায় জটিলতা হচ্ছে একেক প্রতিষ্ঠানে একেকভাবে টুলস ব্যবহার করা হয়। এতে করে একটি প্রতিষ্ঠানে পজেটিভ এলে আরেকটিতে নেগেটিভও আসতে পারে, আবার এর উল্টোটাও হতে পারে।’ হবিগঞ্জের সিভিল সার্জনের মৃত্যুর বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তিনি একজন চিকিৎসক হয়েও ডেঙ্গুর কোনো পরীক্ষা করিয়েছিলেন কি না তা আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাঁকে কিভাবে আমরা এখন ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে বলতে পারি?’

এদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

 

মন্তব্য