kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

আসাদের ছবিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রচ্ছদ

মায়ের কোলেও কত ভয়!

মেহেদী হাসান   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মায়ের কোলেও কত ভয়!

সব হারিয়ে শিশুসন্তানকে বুকে আগলে ধরে ডাঙার দিকে ছুটছেন এক রোহিঙ্গা নারী। কিন্তু ‘সভ্যতার’ এই যুগে মায়ের কোলও যে নিরাপদ নয়, সেই ছায়া শিশুটির চোখে-মুখে স্পষ্ট।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারে আলোকচিত্রী খোন্দকার মোহাম্মদ আসাদের তোলা এই ছবি স্থান পেয়েছে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর আগস্ট মাসের সংস্করণের প্রচ্ছদে।

রোহিঙ্গাদের ঢলের দুই বছর পূর্তির সংখ্যায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ছুটে আসা ব্যক্তিদের আলোকচিত্র প্রয়োজন ছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের। কঠিন সব শর্ত পূরণ করে অন্য সব আলোকচিত্রকে পেছনে ফেলে আসাদের আলোকচিত্রটিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছে।

বিশাল এ অর্জনের ছবির প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে আসাদ জানান, সময়টা ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। দু-এক দিন এদিক-ওদিকও হতে পারে। প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের নৌকাডুবি ও বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু বিশ্ব গণমাধ্যমে বড় খবর হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গাদের এ দেশে আসার ছবি তোলার জন্য তিনিসহ কয়েকজন আলোকচিত্রী অপেক্ষা করছিলেন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে। সেদিন অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও মিয়ানমার থেকে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের কোনো নৌকা আসছিল না। ভালো ছবি তুলতে একসময় অন্যত্র যাওয়ার প্রস্তাব উঠলেও তিনি আরো ১৫ মিনিট অপেক্ষার কথা বলেন। এরই মধ্যে সাগরে অনেক দূরে তাঁদের চোখে পড়ে একটি বিন্দুর মতো কিছু একটা। ক্যামেরায় লেন্সে দেখতে পান অপেক্ষমাণ নৌকা। ভয়ে তারা এদিকে আসছে না—এমনটি বোঝার পর খবর পাঠিয়ে তাদের অভয় দেওয়া হয়।

কে এম আসাদ জানান, নৌকাটি যে তীরে এত দ্রুত আসবে, তা তিনি ধারণাও করেননি। সে  জন্য সময়ও পেয়েছেন কম। নৌকাটি তীরের কাছাকাছি আসার পর রোহিঙ্গারা পানিতে  নেমেই তীরের দিকে ছুটছে। আর আলোকচিত্রীরাও চেষ্টা করছেন ছবি তুলতে।

তিনি জানান, চোখ ক্যামেরার লেন্সে। একটি শিশুকে বুকে আগলে নিয়ে মা আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। শিশুটির চোখে অসহায়, ভয়ার্ত দৃষ্টি। এই ফ্রেমে পাঁচ থেকে ছয়টি ছবি তুলতে পেরেছিলেন তিনি। সে সময়ই তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো সেরা একটি ছবি তিনি তুলতে পেরেছেন। এই ছবিতে যুদ্ধ-বিগ্রহের বীভৎসতা নেই; কিন্তু আছে ভয়-শঙ্কা।

আসাদ জানান, কয়েক দিন আগেই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একজন সম্পাদক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হিসেবে ছবিটি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলেন এবং বেশ কিছু তথ্য চান। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহার করতে হলে ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের সম্মতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এই ছবির দুজনকে বের করবেন কিভাবে? আর এসব ছবি তোলার সময় কি তাদের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করা হয়?

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে আসাদ প্রশ্ন করলেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সংঘাতের সময় কি লোক চিনে ছবি তোলা সম্ভব? তাঁর এই প্রশ্নে নড়েচড়ে বসে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক কর্তৃপক্ষ। পরে তাদের আইনজীবী প্যানেলও সিদ্ধান্ত নেয় এই ছবি প্রচ্ছদ হিসেবে প্রকাশে কোনো বাধা নেই।

শেষ পর্যন্ত ছবিটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রচ্ছদ হিসেবে স্থান পাওয়ায় খুব খুশি আসাদ। এই দিনটিকে জীবনের অন্যতম সেরা দিন হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। তবে আসাদের অর্জন এটিই প্রথম নয়। একটি রোহিঙ্গা কন্যাশিশুর দুই চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠা ছবিটিও তাঁর তোলা।

কে এম আসাদ মূলত একজন ফ্রিল্যান্স ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার। জুমা প্রেস ও গেটি ইমেজের সঙ্গেও কাজ করেন তিনি। ২০১২ সাল থেকে তিনি ক্যামেরার লেন্স দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট দেখছেন। রোহিঙ্গাদের কারণে কিভাবে উখিয়া-টেকনাফ বদলে গেছে, তা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন।

 

মন্তব্য